গ্রীসের থিয়েটার বা
নাট্যচর্চার ইতিহাস এবং এর বিবর্তন সম্পর্কে একটি বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা
হলো:
১. নাটকের উৎস ও
ডিওন্যুসাস উৎসব: গ্রীক নাটকের আদি উৎস
হলো "ব্যালাড-ডান্স" বা "গাথা-নৃত্য", যেখানে
কথা, সঙ্গীত এবং অনুকৃত দেহভঙ্গির এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল। আদিম গ্রীসে বীরগাথা ও
মদিরা-দেবতা ডিওন্যুসাস বা বাকুয়াসের উৎসবকে কেন্দ্র করেই এই নৃত্যের
বিকাশ ঘটে। ডিওন্যুসাসের সম্মানে গীত এই গান বা সুরকে বলা হতো "ডিথ্যুরাম্ব"
(Dithyramb)। ট্র্যাজেডি শব্দের উৎপত্তিও হয়েছে গ্রীক শব্দ 'ত্রাগোয়দেয়িয়া'
(tragoedeia) থেকে, যার অর্থ হলো 'ছাগ-সঙ্গীত'।
২. নাট্যকার ও অভিনেতার
বিবর্তন: গ্রীক নাটকের বিবর্তনে
কয়েকজন প্রধান নাট্যকারের অবদান অনস্বীকার্য:
- থেসপিস
(Thespis): তিনি নাট্য-ইতিহাসে প্রথম অভিনেতা
বা 'অ্যাকটর' (Actor)-এর প্রবর্তন করেন, যিনি কোরাস বা গায়কদলের থেকে
আলাদা হয়ে এককভাবে কথোপকথন চালাতেন।
- আইস্কাইলাস
(Aeschylus): তিনি নাটকে দ্বিতীয় অভিনেতা
নিয়ে আসেন, যার ফলে নাটকের কোরাসের প্রাধান্য কমতে শুরু করে এবং কথোপকথন বা
সংলাপের গুরুত্ব বাড়ে।
- সোফোক্লেস
(Sophocles): তিনি তৃতীয় অভিনেতা আনয়ন
করেন, যা নাট্যক্রিয়াকে আরও জটিল ও বাস্তবধর্মী করে তোলে।
- ইউরিপিদেস
(Euripides): তাঁর আমলে নাটকে বাস্তবতার
(Realism) আবির্ভাব ঘটে এবং তিনি চরিত্রায়নে অধিক গুরুত্ব দেন।
৩. গ্রীক রঙ্গমঞ্চের
গঠন (Theatre Architecture): গ্রীসের
রঙ্গমঞ্চের প্রধান অংশগুলি ছিল:
- অরখেস্ত্রা
(Orchestra): এটি ছিল কোরাসের জন্য নির্দিষ্ট
একটি বৃত্তাকার ভূমি, যেখানে তারা নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশন করত।
- স্কেনে
(Skene): অরখেস্ত্রার পিছনে নির্মিত একটি
ঘর বা পটভূমি, যেখানে অভিনেতারা পোশাক পরিবর্তন করতেন। পরবর্তীকালে এটি
নাটকের স্থায়ী দৃশ্যপট হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
- থিয়েট্রোন্
(Theatron): দর্শকদের বসার স্থান, যা
পাহাড়ের ঢালে ধাপ কেটে তৈরি করা হতো।
- লোগেইওন্
(Logeion): অভিনেতাদের জন্য নির্মিত উঁচু
বেদী বা মঞ্চ।
- প্যারোডোস্
(Parodos): অরখেস্ত্রায় কোরাস বা অভিনেতাদের
প্রবেশের দুই পাশের পথ।
৪. মঞ্চের যান্ত্রিক
পদ্ধতি ও কলাকৌশল: নাটকের দৃশ্যপট
পরিবর্তন ও নাটকীয় আবহ তৈরির জন্য প্রাচীন গ্রীসে বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করা হতো:
- পেরিয়াকুতই
(Periaktoi): এটি ছিল এক ধরণের তিনকোনা
প্রিজমাকৃতি যন্ত্র, যা ঘুরিয়ে নাটকের দৃশ্যপট পরিবর্তন করা যেত।
- এক্ক্লাইমা
(Ekkyklema): এটি একটি চাকাওয়ালা মঞ্চ বা প্ল্যাটফর্ম
ছিল, যার সাহায্যে গৃহভ্যন্তরের কোনো দৃশ্য (যেমন মৃতদেহ) মঞ্চের সামনে আনা
হতো।
- দেউস্-এক্স্
ম্যাথিনা (Deus ex machina): এটি একটি
ক্রেন জাতীয় যন্ত্র ছিল, যার সাহায্যে দেবতাদের আকাশ থেকে মঞ্চে অবতরণ করানো
হতো।
৫. কমেডি ও পরবর্তী
যুগ: ট্র্যাজেডির পাশাপাশি গ্রীসে কমেডিরও উদ্ভব
ঘটে। কমেডির মূল উপাদান ছিল আতিকার জনপ্রিয় গ্রাম্য অনুষ্ঠান 'কোমাস' (Comus)।
এরিস্টোফানেস ছিলেন ওল্ড কমেডির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। পরবর্তীকালে হেলেনীয়
যুগে মেনান্দারের হাত ধরে 'নিউ কমেডি'র বিকাশ ঘটে, যা ছিল অনেক বেশি ঘরোয়া এবং
বাস্তবধর্মী।
সামগ্রিকভাবে, গ্রীক
থিয়েটার কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের এক
অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা পরবর্তীকালে সমগ্র বিশ্বনাট্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।