শিল্পকলা পাঠ ও অনুশীলন – ৪ (আলোক পরিকল্পনা) কোর্সের শিক্ষক ড. কামালউদ্দিন কবির স্যার কর্তৃক প্রদত্ত একটি বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট বা ব্যবহারিক কাজের অংশ হিসেবে প্রাকৃতিক আলোর প্রধান উৎস (সূর্যের আলো) এবং সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিনে এর রূপ পরিবর্তনের ধারা পর্যবেক্ষণ করি। সে সম্পর্কে লিখেছি...
আমি
থিওরিটিক্যাল বা তাত্ত্বিক আলোচনা প্রয়োগ করার আগে নিজস্ব সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে
পুরো দিনটি ধরে সূর্যের আলোর এই রূপ
পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। এই কাজের অংশ হিসেবে আমি পুরান ঢাকার
বিভিন্ন স্থান(বিশেষত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে) এবং বুড়িগঙ্গা নদী এলাকায়
বন্ধুদের সাথে ভ্রমণ করি। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ৩টি অংশে ভাগ করেছি।
১. সকালের আলোর পর্যবেক্ষণ (সকাল ৮:২০ - ৮:৩০)
- স্থান: নবাব
ইউসুফ জামে মসজিদ এবং ইসলামপুর-পাটুয়াটুলী এলাকা।
- আলোর প্রকৃতি:
সকালের আলো অত্যন্ত নরম বা সফট
(Soft) হয়।
- মূল পর্যবেক্ষণ:
সকালের প্রাকৃতিক আলোর বাস্তবিক রূপটি হলো, সূর্যের আলো সরাসরি যেখানে পড়ে
(যেমন মসজিদের ফোকাস পয়েন্ট), সেই অংশটি তীব্র উজ্জ্বল দেখায়। কিন্তু এর ঠিক
বিপরীত বা ছায়াযুক্ত অংশগুলো একেবারেই অন্ধকার দেখায়।
- ব্যাকগ্রাউন্ড লাইটের প্রভাব: আমি লক্ষ্য করি যে, আকাশের নীল রঙের ব্যাকগ্রাউন্ড
লাইটিং সামনের বস্তুকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে।
- পুরান ঢাকার গুরুত্ব: প্রাকৃতিক আলো বোঝার জন্য পুরান ঢাকা অত্যন্ত চমৎকার
একটি জায়গা। ঢাকার বহুতল ভবনগুলোর কারণে আলো বিভিন্ন জায়গায় বাধা পায়, ফলে
কোথাও আলো আর কোথাও তীব্র অন্ধকার বা ছায়ার চমৎকার দৃশ্য সৃষ্টি হয়।
২. দুপুরের আলোর পর্যবেক্ষণ (দুপুর ১:৪০ - বিকাল
২:৫০)
- স্থান: বুড়িগঙ্গা
নদী এবং নদী তীরবর্তী এলাকা।
- আলোর প্রকৃতি:
দুপুর ১:৪০-এর দিকে সূর্যের আলো অত্যন্ত কড়া এবং তীব্র থাকে।
- মূল পর্যবেক্ষণ:
- সরাসরি
মাথার উপর থেকে রোদ পড়ার কারণে চোখের নিচে ও মুখের কিছু অংশে অন্ধকার বা
শ্যাডো তৈরি হয়।
- রোদের
কড়া আলোর কারণে কোনো সাদা ভবনের ওপর যখন আলো পড়ে, তখন সেটি অতিরিক্ত উজ্জ্বল
দেখায়।
- বুড়িগঙ্গা
নদীতে চলার সময় পানির মৃদু ঢেউয়ের মধ্যেও আলো ও ছায়ার এক চমৎকার খেলা লক্ষ্য
করা যায়। যা ঢেউকে আরো দৃশ্যমান করে।
- এছাড়া
সময়ের সাথে সাথে সূর্যের স্থান পরিবর্তনের বিষয়টিও (মুভিং লাইট) এখানে
স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
- বিকাল ২:৫০-এর দিকে: সূর্যের তীব্রতা (intensity) আস্তে আস্তে কমতে থাকে এবং
পরিবেশ কিছুটা ঠান্ডা হতে শুরু করে, যার ফলে গাছের ছায়াগুলো মাটিতে স্পষ্ট
হওয়া থেকে মিলিয়ে যেতে শুরু করে।
৩. বিকালের আলো ও সূর্যাস্ত (বিকাল ৪:২০ - ৪:৫৩)
- বিকাল ৪:২০: এই সময়ে
সরাসরি সূর্যের দেখা মেলা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ভবনের কোণে আলতো একটি আলোর ফোকাস
বা লাইটিং সোর্স অবশিষ্ট থাকে, যা সময়ের সাথে সাথে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে
থাকে।
- বিকাল ৪:৫৩ (সূর্যাস্ত): সূর্য পুরোপুরি অস্ত যায় এবং আর কোনো সরাসরি আলো থাকে
না। সূর্যাস্তের এই সময়টা কুয়াকাটার মতো জায়গায় অনেক সুন্দর দেখায়, যেখানে
সূর্যকে ডিমের লাল কুসুমের মতো দেখায়। সূর্য ডোবার পর মানুষ আবার কৃত্রিম
আলোর সাহায্যে সবকিছু আলোকিত করে তোলে।
আমি এতক্ষণ যা কিছু লিখলাম বা বললাম তা
পাঠ্যে রয়েছে। মানে পাঠ্যপুস্তকের
বিষয়গুলো আমাদের চোখের সামনেই থাকে, কিন্তু আমরা সচরাচর তা লক্ষ্য করি না। এই
অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করতে গিয়েই আমার চোখে প্রথম সূর্যের আলোর এই অসাধারণ রূপ ও
কারিশমা ধরা পড়েছে। এর আগে কত সূর্য দেখেছি। কিন্তু এত দেখার মত দেখা হয়নি। নাটকে
যেমন ব্যাক স্টেজ লাইট কোনো ক্যারেক্টারের বর্ডার বা লাইনগুলোকে উজ্জ্বল করে তাকে
ফুটিয়ে তোলে, প্রাকৃতিক আলোতেও ব্যাকগ্রাউন্ডের আলো ক্যারেক্টার বা বস্তুকে ফুটিয়ে
তুলতে ঠিক একই ভূমিকা পালন করে।
থিয়েটার বা নাটকের ক্ষেত্রে বইয়ের তত্ত্ব মুখস্থ করার চেয়ে উপস্থিত
বুদ্ধি খাটিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে লাইটের পরিবর্তন করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর।
চলচ্চিত্রের প্রচলিত ধারণার মতো এমন মনে করা হয়, "First shot is the best shot". লাইটিং-এর ক্ষেত্রেও কথাটির
মত প্রযোজ্য হওয়া উচিত- তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তই সেরা সিদ্ধান্ত। লাইটের উপর আরো
লিখব, এই লেখা সূচনা।
পরিশেষে, কেউ যদি দিনের বেলার প্রাকৃতিক আলো বুঝতে চায়, তবে তার
জন্য ঢাকা শহর সেরা চয়েস হতে পারে। কিন্তু রাতের আলোর খেলা বুঝতে হলে তাকে অবশ্যই
গ্রামে যেতে হবে, কারণ রাতে ঢাকা শহর কৃত্রিম আলোয় অতিরিক্ত আলোকিত থাকে। আমারও
ইচ্ছা রাতের আলো বোঝার জন্য একবার গ্রামে যাব।
মুহাম্মদ
আল ইমরান
শিক্ষার্থী,
নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
ভিডিও দেখুন...
