গ্রাম থিয়েটার - মুহাম্মদ আল ইমরান

 

গ্রাম থিয়েটার

গ্রাম থিয়েটার হলো বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি মূলত গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা, সুখ-দুঃখ, বিশ্বাস, ধর্মীয় আখ্যান এবং সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক অনন্য নাট্যধারা। বাংলার হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতি ও নাট্য ঐতিহ্যকে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে চলেছে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। এই আন্দোলনের মূল স্লোগান হলো— "হাতের মুঠোয় হাজার বছর আমরা চলেছি সামনে"। এটি কেবল নাটক মঞ্চায়নের একটি সংগঠন নয়, বরং বাঙালির নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এই আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ছিলেন বিশিষ্ট নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। ঢাকা থিয়েটারের তত্ত্বাবধানে ২০ জানুয়ারি ১৯৮২ (৬ মাঘ ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ) মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার তালুকনগর গ্রামে এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। তালুকনগর গ্রামের শাহ আজহার বা আজাহার বয়াতীর ঐতিহ্যবাহী মাঘী মেলাকে কেন্দ্র করেই এর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সেলিম আল দীন মানিকগঞ্জের এই সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি থেকেই তার বিখ্যাত নাটক 'কীত্তনখোলা'-র রসদ খুঁজে পেয়েছিলেন, যার চরিত্র 'মনাই বয়াতী' মূলত শাহ আজহারের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত।

 

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার পাশ্চাত্য নাট্যরীতির অনুকরণ না করে বাঙালির নিজস্ব বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি ও অভিনয় শৈলী উদ্ভাবন ও চর্চায় মনোনিবেশ করে। তাদের নাট্যরীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • চৌকোণা খোলা মঞ্চ: পাশ্চাত্য প্রোসেনিয়াম মঞ্চের পরিবর্তে গ্রাম থিয়েটার বাঙালির চিরাচরিত যাত্রার ঢঙে খোলা মঞ্চ ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। তবে এই মঞ্চের বিশেষত্ব হলো এর চারদিকেই দর্শকদের প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ থাকে।
  • বর্ণনাত্মক অভিনয়: ঢাকা থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটার যৌথভাবে এমন এক অভিনয় রীতি গড়ে তোলে যেখানে বর্ণনার মাধ্যমে নাটকের ঘটনা ও চরিত্র ফুটে ওঠে।
  • ঐতিহ্য সংরক্ষণ: লোকজ সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং চর্চা অব্যাহত রাখা এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

১৯৮৩ সালে গঠিত 'তালুকনগর থিয়েটার' ছিল এই আন্দোলনের প্রথম সক্রিয় সংগঠন। এর পর দ্রুতই বংশাই থিয়েটার, গৌরাঙ্গী থিয়েটারসহ সারা দেশে শাখা ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে সারা দেশে দুই শতাধিক সংগঠন এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত। কাজের সুবিধার্থে সারা দেশকে ৩৬টি অঞ্চলে এবং ৮টি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো পাঁচ স্তরে বিন্যস্ত:

১. উপদেষ্টা পর্ষদ

২. জাতীয় পর্ষদ

৩. কেন্দ্রীয় পর্ষদ

৪. বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পর্ষদ

৫. ইউনিট সংগঠন

 

সংগঠনটি তার আদর্শিক সংহতি বজায় রাখতে নিয়মিত জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করে। উল্লেখযোগ্য কিছু সম্মেলন হলো:

  • প্রথম জাতীয় সম্মেলন: ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সংগঠনের খসড়া গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়।
  • চতুর্থ জাতীয় সম্মেলন (১৯৯৯): পুঠিয়া রাজবাড়ী মাঠে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ষষ্ঠ বাংলা লোকনাট্য উৎসবও পালিত হয়।
  • সপ্তম জাতীয় সম্মেলন (২০১৬): এই সম্মেলনে নাসির উদ্দীন ইউসুফকে সভাপতি ও তৌফিক হাসান ময়নাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করা হয়।

 

গ্রাম থিয়েটার কেবল মঞ্চে সীমাবদ্ধ না থেকে নাট্যকর্মীদের মান উন্নয়নে বিভিন্নমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে। তারা নিয়মিতভাবে তাত্ত্বিক কর্মশালা, অভিনয় কর্মশালা, নাট্যকার প্রশিক্ষণ এবং নারী নাট্যকর্মী প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। যেমন— ২০২৬ সালের জুন মাসে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে তিন দিনব্যাপী একটি 'অভিনয় নির্দেশনা বিষয়ক কর্মশালা' অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৪৫ জনের মত অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও সংগঠনটি নিয়মিতভাবে 'গ্রাম থিয়েটার পত্রিকা' এবং 'ঢাকা বিভাগের মুখপত্র' নামে দুটি ষাণ্মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে। কেন্দ্র ও বিভিন্ন ইউনিট থেকে বেশ কিছু নাটক প্রকাশিত হয়েছে।

 

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার আজ কেবল একটি নাম নয়, বরং এটি বাংলার শিকড় সন্ধানী মানুষের পরিচয়। সেলিম আল দীনের কালজয়ী নাট্যদর্শন আর গ্রাম থিয়েটারের সদস্যদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন বাঙালির আত্মপরিচয়কে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিচ্ছে। গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া এই নাট্যবিপ্লবই ভবিষ্যতে বাঙালির জাতীয় নাট্য আঙ্গিককে আরও সমৃদ্ধ করবে।

 

 

তথ্যসূত্র: গ্রাম থিয়েটার ওয়েবসাইট, ইন্টারনেটের বিভিন্ন নিউজ ও ফিচার।