মানবসভ্যতার
আদিমতম প্রকাশ মাধ্যম হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতি। যুগে যুগে সমাজ পরিবর্তনের সাথে
সাথে এই দুই মাধ্যমের রূপও বদলেছে। একসময় যা ছিল দেয়ালচিত্র, তা একপর্যায়ে রূপ নেয়
তালপাতার পুঁথিতে, এরপর ছাপাখানার আবিষ্কারে আসে কাগজের বই। আর এখন সেই সাহিত্য ও
সংস্কৃতি প্রবেশ করেছে সম্পূর্ণ এক নতুন যুগে— যাকে আমরা বলছি 'ডিজিটাল যুগ'। এই
ডিজিটালাইজেশন বা প্রযুক্তির ছোঁয়া কেবল মাধ্যম পরিবর্তন করেনি, বরং সাহিত্য
সৃষ্টি, সংস্কৃতি প্রকাশ এবং দর্শকের কাছে তা পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়াটিকেই আমূল
বদলে দিয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী
ছাপাখানার গণ্ডি পেরিয়ে সাহিত্য এখন উন্মুক্ত ওয়েবসাইটের পাতায় ও সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ব্লগিং, অনলাইন ম্যাগাজিন(ই-ম্যাগাজিন) এবং সাহিত্য পোর্টালগুলোর কারণে এখন যেকোনো
লেখক মুহূর্তের মধ্যে তার সৃষ্টি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারছেন। এর ফলে প্রকাশকের
মর্জির ওপর নির্ভর করার দিন শেষ হয়েছে। তরুণ ও প্রতিভাবান লেখকেরা সহজেই তাদের
পাঠকশ্রেণী তৈরি করতে পারছেন। এছাড়া 'কিন্ডল' বা বিভিন্ন ই-বুক অ্যাপের কল্যাণে
হাজার হাজার বই এখন মানুষের পকেটে, একটি স্মার্টফোনের ভেতরেই বন্দি।
ডিজিটাল যুগের
অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো পাঠক ও লেখকের মধ্যকার সরাসরি যোগাযোগ। আগে একটি বই বা
প্রবন্ধ পড়ার পর পাঠকের প্রতিক্রিয়া লেখকের কাছে পৌঁছাতে মাসের পর মাস লেগে যেত,
কিংবা অনেক সময় পৌঁছাতই না। কিন্তু এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা বিভিন্ন অনলাইন
সাহিত্য গ্রুপে লেখা প্রকাশের সাথে সাথেই পাঠক তার ভালো লাগা, মন্দ লাগা বা
গঠনমূলক সমালোচনা কমেন্ট সেকশনে জানিয়ে দিতে পারেন। যেমন কিছুদিন আগেই আমি রবীন্দ্র
বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এর সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং চেয়ারম্যান দেবশ্রী
দোলন এর লেখা প্রবন্ধ পড়ে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। এই
ধরণের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া লেখকদের যেমন অনুপ্রাণিত করে, তেমনি লেখার
মানোন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছি।
সাহিত্যের
পাশাপাশি আমাদের সংস্কৃতিতেও এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সিনেমা, নাটক, গান কিংবা
লোকশিল্প এখন আর কেবল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় বা টেলিভিশনের পর্দায় আটকে নেই।
ইউটিউবের মতো গ্লোবাল মিডিয়ার কল্যাণে দেশীয় সংস্কৃতি খুব সহজেই আন্তর্জাতিক
দরবারে পৌঁছে যাচ্ছে। বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল ও অডিও প্রোডাকশনের মাধ্যমে সাহিত্যকে আরও
আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। পডকাস্ট বা অডিওবুকের জনপ্রিয়তা এর অন্যতম
উদাহরণ, যেখানে ব্যস্ত মানুষ চোখ না বুলিয়েও কেবল কান দিয়ে সাহিত্য উপভোগ করতে
পারছেন। এ বছর(২০২৬) আমি শুধুমাত্র রোজার ঈদের বন্ধের সময় বেশ কিছু অডিও বই
শুনেছি। সেগুলো হলো:
১. হিমু ও
হার্ভার্ড পিএইচডি বল্টু ভাই - হুমায়ূন আহমেদ
২.
হিমুর নীল জোছনা - হুমায়ূন আহমেদ
৩.
কিছুক্ষণ - হুমায়ূন আহমেদ
৪.
আজ হিমুর বিয়ে - হুমায়ূন আহমেদ
৫.
হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম - হুমায়ূন আহমেদ
৬.
ময়ূরাক্ষী - হুমায়ূন আহমেদ
৭.
আ ক্রিসমাস ক্যারল - চার্লস ডিকেন্স
৮.
পাখির পালক(ছোটগল্প) - হুমায়ূন আহমেদ
৯.
একটি নীল বোতম(ছোটগল্প) - হুমায়ূন আহমেদ
১০.
অয়োময়(ছোটগল্প) - হুমায়ূন আহমেদ
১১. এই শুভ্র,
এই! - হুমায়ূন আহমেদ
এই লিস্টে হুমায়ূন
আহমেদ এর হিমু সিরিজ বেশি। এর কারণ আছে! একাডেমিক বইয়ের বাহিরে আমার বই পড়ার জার্নি
শুরু হয় হুমায়ূন আহমেদকে দিয়ে। বইটির নাম 'আমার ছেলেবেলা'। এজন্য যখন হুমায়ূন আহমেদকে
আমি ধন্যবাদ দেই তখন অনেকে ভাবেন আমি 'হিমু', 'শুভ্র' ও 'মিসির আলী' ইত্যাদি পড়ে
ইমরান হিমুর মত খালি পায়ে পকেটহীন হলুদ পাঞ্জাবি পরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে বেড়ানো
এক ছন্নছাড়া এবং যুক্তিহীন(অ্যান্টি-লজিক) চরিত্র হয়ে যাচ্ছে। অথবা শুভ্রর মত বাস্তব
জগত সম্পর্কে আনাড়ি, মোটা চশমা পরা এক সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক, সত্যবাদী ও শুদ্ধ স্বভাবের
মানুষ। কিংবা মিসির আলীর মত যেকোনো অলৌকিক বা রহস্যময় ঘটনাকে কঠোর বিজ্ঞান, লজিক ও
মানব-মনস্তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা এক একাগ্র গবেষক। ইত্যাদি ইত্যাদি হয়ে যাচ্ছে
বা হবে। আমার পড়ার জার্নি হুমায়ূন আহমেদকে দিয়ে শুরু হলেও ঐ চরিত্রগুলো আমার পড়া
হয়নি। তাই ঈদের ছুটিতে শুরু করলাম হিমু দিয়ে। এরপর অনন্ত দূর্বার সঙ্গে এই বিষয়ে
আলাপ হলো সে বলল শুভ্র ও মিসির আলী আরো চমৎকার। তারপর শুভ্র শুনলাম। এখন একদিন শুনে
নিব মিসির আলী।
যাইহোক, ডিজিটাল
যুগের যেমন অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি কিছু সংকটও তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেটে
তথ্যের এই বিপুল সমুদ্রে মানসম্মত লেখা খুঁজে পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার তাড়নায় অনেক সময় লেখার গভীরতা ও
ব্যাকরণগত শুদ্ধতা হারিয়ে যাচ্ছে। বলা যায় অনেক ‘অলেখক’ তৈরি হচ্ছে। এছাড়া
'পাইরেসি' বা কপিরাইট লঙ্ঘনের কারণে লেখকেরা তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও আর্থিক
পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বইয়ের পাতা ওল্টানোর যে চিরন্তন আনন্দ, স্ক্রিনের
আলোতে তা কিছুটা হলেও ম্লান হচ্ছে।
পরিবর্তন
প্রকৃতির নিয়ম এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতি সেই নিয়মের বাইরে নয়। ডিজিটাল যুগ আমাদের
সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারকে যেমন সহজ এবং গতিশীল করেছে, তেমনি আমাদের সামনে কিছু
চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির এই জোয়ারকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
মেধা, সৃজনশীলতা এবং সঠিক টিম ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে যদি ডিজিটাল
প্ল্যাটফর্মগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই বিবর্তন
মানবসভ্যতাকে আরও সমৃদ্ধ ও একতাবদ্ধ করবে। সবাই দিনশেষে বই পড়তে শুরু করবে,
পৃথিবীকে পরিবর্তন করে দিবে ইতিবাচকভাবে এই কামনা করি।
মুহাম্মদ আল
ইমরান
বংশাল, ঢাকা
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
খ্রিস্টাব্দ।
