বাংলাদেশে আধুনিক নাট্যচর্চার পথিকৃৎ: ড্রামা সার্কেল



গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের পটভূমি ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট

বিশ্বে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে দলগত নাট্যচর্চা বা গ্রুপ থিয়েটারের সূচনা ঘটে ১৯৩১ সালে নিউইয়র্কে লি স্ট্রাসবার্গ, হ্যারল্ড ক্লারম্যান এবং চেরি ক্রফোর্ডের 'গ্রুপ থিয়েটার' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ভারতীয় উপমহাদেশে এই ধারার বিকাশ ঘটে চল্লিশের দশকে 'ভারতীয় গণনাট্য সংঘ' (আইপিটিএ)-এর হাত ধরে, যা পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালে বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্র পরিচালিত 'নবান্ন' নাটকের পাশাপাশি 'ছিঁড়া তার' ও 'উলুখাগড়া'-র মতো প্রযোজনার মাধ্যমে জোরালো রূপ নেয়।

ড্রামা সার্কেলের প্রতিষ্ঠা ও প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে যখন নিজস্ব শিল্প ও সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন নাট্যাভিনয় প্রধানত চারটি ধারায় সীমাবদ্ধ ছিল—অফিস বা সংস্থার বার্ষিক বিনোদন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক অনুষ্ঠান, সৌখিন গোষ্ঠীর বিনোদনমূলক নাটক এবং পেশাদার যাত্রাদল। এই ধরনের প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে একটি সুস্থ নাট্য আন্দোলন গড়ে তুলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষিত তরুণ ১৯৫৬ সালে 'ড্রামা সার্কেল' গঠন করেন। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথম শখের গোষ্ঠীভিত্তিক নাট্যদল এবং এ অঞ্চলে আধুনিক গ্রুপ থিয়েটার চর্চার ভিত্তি স্থাপনকারী পথিকৃৎ সংগঠন।

বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ইতিহাসে ড্রামা সার্কেল (Drama Circle) এক যুগান্তকারী ও পথিকৃৎ নাট্যসংগঠন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যখন প্রথাগত ও শখের নাট্যাভিনয় প্রাধান্য পাচ্ছিল, তখন ড্রামা সার্কেলই প্রথম আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক 'গ্রুপ থিয়েটার' ভিত্তি স্থাপন করে।

  • জন্মসাল: ড্রামা সার্কেলের জন্ম ১৯৫৬ সালে, তবে এর প্রস্তুতি চলছিল ১৯৫৪ সাল থেকেই।
  • পটভূমি: ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের বার্ষিক নাট্যাভিনয় এবং কার্জন হলে মুনীর চৌধুরীর 'কবর' নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে তরুণ নাট্যকর্মীদের মধ্যে যে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটে, তার ধারাবাহিকতায় ড্রামা সার্কেল আত্মপ্রকাশ করে।

নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো

ড্রামা সার্কেলের সূচনা ও পরিচালনার নেপথ্যে ছিলেন সৈয়দ মকসুদসু সালেহীন, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, তৌফিক আজিজ খান এবং বজলুল করিমের মতো বিশিষ্ট নাট্যাশিল্পীরা।

  • প্রথম সভাপতি: সংগঠনের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান (আবু জাফর ওয়াহিদুল্লাহ খান)।
  • পরবর্তী সভাপতি: পরবর্তীতে সাহিত্যিক হাসান হাফিজুর রহমান এবং অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
  • পরিচালক প্রথা: পরবর্তীতে পরিচালনার কাঠামো সহজ করতে সভাপতির পদটি বাতিল করে 'পরিচালক' ব্যবস্থা চালু করা হয়, যেখানে প্রথম পরিচালক হন মীর মকসুদসু সালেহীন এবং পরবর্তীতে বজলুল করিম পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
  • মূল চালিকাশক্তি: ১৯৬১ সাল পর্যন্ত মীর মকসুদহুস সালেহীন ও বজলুল করিম যৌথভাবে ড্রামা সার্কেল পরিচালনা করেন। সালেহীন উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে চলে যাওয়ার পর বজলুল করিম একাই দলটির মূল চালিকাশক্তি ও নাট্য নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেন।

মীর মকসুদসু সালেহীন ও বজলুল করিম শেষ দিন পর্যন্ত দলের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং নারী কর্মী হিসেবে রুনু শেষ দিন পর্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

গবেষণা, কর্মশালা ও কারিগরি উদ্ভাবন

সেই সময়ে দেশে নাট্যতত্ত্ব বা নাটকের পর্যাপ্ত বই না থাকায় দলের কর্মকারীরা ঢাকার বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে তাদের লাইব্রেরি থেকে ইংরেজি নাটকের বই সংগ্রহ করে পাঠ করতেন। নাট্য পরিবেশনার পাশাপাশি কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারা ১৯৫৯ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী মঞ্চ পরিকল্পনার ওপর বিশেষ কোর্স পরিচালনা করেন।

প্রযোজনা ও পরিবেশনাশৈলীর দিক থেকে ইংরেজি 'লেজিটিমেট থিয়েটার'-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত ড্রামা সার্কেল তৎকালীন নাট্যধারায় এক বিপ্লবী পরিবর্তন নিয়ে আসে। তৎকালীন প্রচলিত দ্বিমাত্রিক সেট বা চ্যাপ্টা পটভূমির পরিবর্তে বাংলাদেশে ড্রামা সার্কেলই প্রথম ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) মঞ্চ পরিকল্পনা ও সেট ডিজাইনের প্রবর্তন করে। এর পাশাপাশি নাটকের আলো ও দৃশ্যপটে গভীরতা আনার জন্য দেশে প্রথমবারের মতো 'সাইক্লোরামা'-র ব্যবহার শুরু করে এই সংগঠনটি। পোশাক পরিকল্পনায় (কস্টুম ডিজাইন) নতুনত্ব আনা এবং আধুনিক নির্দেশনারীতি অনুসরণের মাধ্যমে তারা প্রযোজনায় পেশাদার মান বজায় রাখার চেষ্টা করেন।

কারিগরি ও নির্দেশনায় নজিরবিহীন উদ্ভাবনগুলো:

  • সাইক্লোরামা (Cyclorama): বাংলাদেশে প্রথম মঞ্চায়নে সাইক্লোরামাতত্ত্বের প্রয়োগ ঘটায় ড্রামা সার্কেল।
  • মঞ্চসজ্জা ও আলো: ঐতিহ্যবাহী চ্যাপ্টা সেটের পরিবর্তে ত্রিমাত্রিক সেট ডিজাইন, পরিচ্ছন্ন আলো প্রক্ষেপণ এবং চরিত্রের আধুনিক পোশাক ভাবনার (কস্টুম) প্রবর্তন করে।
  • নির্দেশনা পদ্ধতি: নির্দেশক বজলুল করিম প্রযোজনা প্রস্তুতির সময় টেবিল-টপ মডেল তৈরি, স্টেজ কোরিওগ্রাফি, দৃশ্যাবলীর বিজনেস ও বাই-প্লে নির্ধারণ এবং প্রাক-মঞ্চায়নে শৃঙ্খলাপরায়ণ রিহার্সাল ও প্রশিক্ষণের প্রথা চালু করেন।

উল্লেখযোগ্য নাট্য প্রযোজনা ও ইতিহাস

প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত প্রথম আট বছরে ড্রামা সার্কেল মোট ১৪টি সফল প্রযোজনা মঞ্চায়ন করে। কেবল ১৯৬১ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যেই তারা ৪টি নাটক মঞ্চস্থ করতে সক্ষম হয়।

তাদের উল্লেখযোগ্য মঞ্চায়নের মধ্যে রয়েছে:

  • স্বদেশী নাটক: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'বহিপীর' (১৯৬১), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাজা ও রানি' (১৯৬১), 'তাসের দেশ' (১৯৬১) ও 'রক্তকরবী', এবং আনিস চৌধুরীর 'মানচিত্র' (১৯৬৭)।
  • অনুবাদ ও বিশ্বনাটক: সোফোক্লিসের 'ইডিপাস' (অনুবাদ: সৈয়দ আলী আহসান), সাইদ আহমেদের 'কালবেলা' (১৯৬২), বার্নার্ড শর 'আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান' (অনুবাদ: বজলুল করিম), এসকাইলাসের 'সপ্তদ্বারের মুখোমুখি' (অনুবাদ: বজলুল করিম), আর্থার মিলারের 'সবাই আমার ছেলে', এবং মুনীর চৌধুরীর অনূদিত 'কেউ কিছু বলতে পারে না' ও সর্বজনবিদিত 'কবর'।

ড্রামা সার্কেলের ইতিহাস ও মঞ্চায়নের ধারাক্রমকে সার্বিকভাবে চারটি পর্বে ভাগ করা হয়— ১. প্রথম পর্ব (১৯৫৬-১৯৫৯) ২. দ্বিতীয় পর্ব (১৯৬১-১৯৬৩) ৩. তৃতীয় পর্ব (১৯৭২-১৯৭৭) ৪. চতুর্থ পর্ব (১৯৭৭-১৯৯৫)

জাতীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা

  • জাতীয় রঙ্গমঞ্চের নকশা: ড্রামা সার্কেলের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সফলতার ওপর ভিত্তি করে ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অনুমোদনে তারা জাতীয় থিয়েটার বা জাতীয় রংমঞ্চের নকশা ও গঠন পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অনুরোধে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা ও নকশা প্রণয়ন করেছিল ড্রামা সার্কেল।
  • উৎসবে অংশগ্রহণ: ১৯৬০ সালে ঢাকা আর্ট কাউন্সিলের লোক উৎসব এবং ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
  • নাট্য প্রশিক্ষণ: নবীন নাট্যকর্মীদের নাট্যকলা ও অভিনয়ে দক্ষ করতে স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করত ড্রামা সার্কেল।

পুনরুজ্জীবন, সংকট ও পথচলার সমাপ্তি

  • বিরতি: ১৯৬৩ সালের পর জীবন ও জীবিকার তাগিদে দলের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ও পেশায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় এবং বজলুল করিমের বিদেশে অবস্থানের কারণে ড্রামা সার্কেলের নিয়মিত কর্মকাণ্ডে দীর্ঘ এক দশক বিরতি ঘটে।
  • পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা: এক দশক পর ১৯৭৩ সালে বার্নার্ড শর 'আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান' নাটকটির প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে বজলুল করিমের উদ্যোগে পুরানো ও নতুন কর্মীদের নিয়ে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু দীর্ঘ বিরতির কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়া মঞ্চ সরঞ্জাম ও আলোকসজ্জা নতুন করে তৈরি করা অত্যধিক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
  • মঞ্চে প্রত্যাবর্তন: ১৯৭৩ সালের সেই প্রদর্শনীর পর পুনরায় সুপ্ত অবস্থায় চলে যাওয়ার পর ১৯৭৭ সালে 'দান্তোর মৃত্যু' নাটক নিয়ে ড্রামা সার্কেল আবারও মঞ্চে প্রত্যাবর্তন করে।
  • বজলুল করিমের প্রয়াণ: ১৯৭৭ সালে 'দানতোঁর মৃত্যু' নাটকের মহড়াকালীন অবস্থায় নির্দেশক ও প্রধান অভিনেতা বজলুল করিম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৫ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর আকুল অনুরোধ ছিল—"তোমরা ড্রামা সার্কেলকে বাঁচিয়ে রেখো"।
  • অবসান: বজলুল করিমের প্রয়াণের পর 'দানতোঁর মৃত্যু' ও 'কবর' মঞ্চস্থ হলেও ড্রামা সার্কেলের নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক পথচলা থমকে দাঁড়ায়।

এই মঞ্চায়নের পর সংগঠনটি তার নিয়মিত গতি হারালেও, তাদের দেখানো পথ ধরে পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যে আধুনিক ও সুসংগঠিত গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা নাট্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

 

 

 

কৃতজ্ঞতা-

কৃপাকণা তালুকদার ম্যাম

প্রভাষক,

নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। 

 

লেখক: মুহাম্মদ আল ইমরান

শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।