স্বাধীনোত্তর বাংলা নাট্যের ইতিহাসে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এক
আলোকবর্তিকাসম নাম। ঔপনিবেশিক শাসনকালের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে নাট্যশিল্পের
ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বা পাশ্চাত্য কাঠামোর (যেমন—অ্যারিস্টটলীয় ট্র্যাজেডি ও
ফ্রেইট্যাগের পিরামিডীয় নাটকীয় কাঠামো) যে অন্ধ অনুকরণ শুরু হয়েছিল, সেলিম আল
দীন তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বাংলা নাটককে পাশ্চাত্য অনুকরণপ্রবণতা
থেকে মুক্ত করে হাজার বছরের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দেশজ নাট্যরীতির শিকড়ে ফিরিয়ে
নিয়ে যান। এই শিকড়সন্ধানী আন্দোলন ও পাশ্চাত্য নাট্যকাঠামো ভাঙার নিরন্তর
চেষ্টার কারণেই সেলিম আল দীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উত্তর-উপনিবেশক
(Post-colonial) নাট্যকার।
উত্তর-উপনিবেশক নাট্যভাবনা ও পাশ্চাত্য মডেলের প্রত্যাখ্যান
উত্তর-উপনিবেশক সাহিত্য চিন্তার মূল উদ্দেশ্য হলো ঔপনিবেশিক শক্তির
সাংস্কৃতিক প্রভাব, পশ্চিমা নন্দনতত্ত্ব ও অন্ধ অনুকরণ থেকে স্বকীয় ঐতিহ্যকে
মুক্ত করা। সেলিম আল দীন সরাসরি ঘোষণা করেন যে তাঁর নাটক উত্তর-উপনিবেশক ধারায়
রচিত।
ইউরোপীয় আধুনিক নাটকের অনুকরণে বাংলা নাটক রচনার প্রচলিত ধারাকে
চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন—গ্রিক রিচুয়াল বা আচার থেকে যদি গ্রিক
ট্র্যাজেডির জন্ম হতে পারে এবং তা থেকে মানববর্তী শিল্পতত্ত্ব রচিত হতে পারে, তবে
প্রাচ্যের ধর্মতত্ত্ব ও ঐতিহ্য থেকে কেন নিজস্ব শিল্পতত্ত্ব অনুসৃত হবে না? তিনি
ইউরোপীয় নাট্যরীতির ছক ভেঙে ঐতিহ্যবাহী বাংলা পাঁচালি ও কথকতার ধারায় সমকালীন
রূপ উন্মোচনের প্রয়াস চালান। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর বিখ্যাত নাটক 'চাকা'-র ভূমিকায়
তিনি উল্লেখ করেন যে, কোনো গায়েন কর্তৃক সত্তর-বাহাত্তর পৃষ্ঠার নাটক গাওয়ার যে
ঐতিহ্যবাহী ভঙ্গি, তা ইউরোপীয় ধাঁচের নাটক থেকে প্রাপ্ত নয় ।
‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’ উদ্ভাবন
সেলিম আল দীনের উত্তর-উপনিবেশক ভাবনার প্রধান তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো
তার উদ্ভাবিত দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব।
- দ্বৈতাদ্বৈতবাদের মূল অর্থ: ‘দ্বৈত’ (দুই) + ‘অদ্বৈত’ (যা দুই নয়) = দ্বৈতাদ্বৈত,
যার প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ হলো 'দুই আবার দুই নয়'।
- তাত্ত্বিক সমন্বয়:
সেলিম আল দীন প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দুটি ভাবদর্শনকে সমন্বিত করে নাট্যশিল্পের
নন্দনতত্ত্বে রূপান্তরিত করেন—
1.
ইরানি
সুফিতত্ত্ব: সুফিবাদের মূল কথা
‘ফানাফিল্লাহ’ ও ‘বাকাবিল্লাহ’, অর্থাৎ স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে লীন হয়ে যান।
একের মধ্যে বহু এবং বহুর মধ্যে এক-এর এই উপস্থিতি নাটকে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
2.
শ্রীচৈতন্যদেবের
অচিন্ত্য দ্বৈতাদ্বৈতবাদ: বৈষ্ণব
ধর্মতত্ত্বের শ্রীরাধা-কৃষ্ণের প্রেম তথা পরমাত্মা ও জীবাত্মার মিলনের দর্শন।
এই দুই দর্শনকে একত্রিত করে তিনি বাংলা নাটকের হাজার বছরের
ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পান, যেখানে একই নাট্যের মধ্যে গান, বাদ্য, নৃত্য, গীত,
কথা ও সংলাপ সব একীভূত থাকে—অর্থাৎ ‘একের মধ্যে বহু আর বহুর মধ্যে এক’। এই
শিল্পতত্ত্ব আবিষ্কারের পর তিনি প্রচলিত অর্থে 'নাটক' রচনা ছেড়ে দিয়ে আখ্যান,
পাঁচালি ও কথকতার রূপ গ্রহণ করেন।
বর্ণনামূলক কথকনাট্য, পাঁচালি ও বিরামচিহ্ন বর্জন
ইউরোপীয় নাটকের অংক ও দৃশ্য বিভাজনের কৃত্রিমতা ভেঙে সেলিম আল দীন
বাংলা আখ্যানরীতির পুনর্ব্যবহার শুরু করেন।
- কথকনাট্য ও পাঁচালি রীতিনীতি: তিনি নাটকে আখ্যানমূলক ভঙ্গি, পাঁচালি, কথকতা,
শাস্ত্রগান ও ‘গুহাঙ্গন থিয়েটার’-এর রূপ ব্যবহার করেন।
- ‘চাকা’ নাটকের দৃষ্টান্ত: তাঁর রচিত ‘চাকা’ নাটকটি একটি অনন্য বর্ণনামূলক
কাব্যনাট্য বা কথকনাট্য, যা পাঠ করলে উপন্যাস পড়ার অনুভূতি তৈরি হয়।
- পাশ্চাত্য ব্যাকরণ প্রত্যাখ্যান: ‘চাকা’ নাটকে তিনি ইউরোপীয় ব্যাকরণের দাঁড়ি, কমা ও
সেমিকোলন ব্যবহারের নিয়ম বর্জন করেন । তাঁর বিশ্বাস ছিল, বাক্যের নিজস্ব
পরিসর বা পরিধিতেই তার অর্থ প্রকাশ পায়; বিরামচিহ্নের কৃত্রিম শাসন নির্দেশক
বা অভিনেতার নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করে ।
নিও-এথনিক থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন
ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা নাগরিক মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক মঞ্চনাটকের
বিপরীতে সেলিম আল দীন নাট্যের প্রাণকেন্দ্রকে নিয়ে যান প্রান্তিক বাংলা ও তার
জনমানুষের কাছে।
- বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার: ১৯৮১-৮২ সালে নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফকে সঙ্গে নিয়ে
তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’, যার মাধ্যমে নাট্যচর্চাকে
শহরের চার দেয়াল থেকে মুক্ত করে গ্রামীণ লোকালয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
- নিও-এথনিক থিয়েটার (Neo-Ethnic Theatre): তিনি আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কেন্দ্র জীবনাচরণ ও
সংস্কৃতিকে করে "নিও-এথনিক থিয়েটার"-এর উদ্ভাবন করেন।
- প্রান্তিক জনজীবন ও লোকজ উপাদান: তার নাটকে—যেমন ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘চাকা’,
‘হরগজ’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘হাতহদাই’, ‘বনপাংশুল’ প্রভৃতিতে—গ্রামবাংলার
সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, নিজস্ব লোকভাষা, মিথ, মৃৎশিল্প ও নৃতাত্ত্বিক
পরিচয় ফুটে উঠেছে।
একাডেমিক গবেষণা ও ‘বাংলা নাট্যকোষ’
সেলিম আল দীন কেবল নাটকরচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না;
উত্তর-উপনিবেশক চিন্তার সপক্ষে শক্ত একাডেমিক ভিত্তি তৈরিতেও তার ভূমিকা অনন্য।
- তিনি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে নাট্যরীতির উপস্থিতি
নিয়ে গবেষণা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
- তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নাটক ও
নাট্যতত্ত্ব বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ‘বাংলা
নাট্যকোষ’ সংগ্রহ, সংকলন ও সম্পাদনা করেন।
- নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘থিয়েটার
স্টাডিজ’ পত্রিকার মাধ্যমে দেশজ নাট্যচর্চার গবেষণাকে এগিয়ে নেন।
সেলিম আল দীন বাংলা নাট্যধারায় পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিক আধুনিকতার
বিপরীতে এক শক্ত স্বজাতীয় ঐতিহ্যকে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সৈয়দ শামসুল হকের
ভাষায়, তিনি ছিলেন "বাংলা নাটকের এক প্রধান পুরুষ", যিনি অনবরত প্রকাশের
নতুন পথ খুঁজে বের করেছেন। ইউরোপীয় নাট্যমডেল বর্জন, দ্বৈতাদ্বৈতবাদী
শিল্পতত্ত্বের প্রয়োগ, কথকনাট্য ও পাঁচালি রূপের উদ্ধার এবং গ্রাম থিয়েটার
আন্দোলনের সূচনা—এই সবকিছু মিলিয়ে সেলিম আল দীন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ও
যুগপ্রবর্তক উত্তর-উপনিবেশক নাট্যকার।
কৃতজ্ঞতা-
কৃপাকণা তালুকদার ম্যাম
প্রভাষক,
নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
লেখক: মুহাম্মদ আল ইমরান
শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
