জঁ রাসিনের 'ফেইড্রা': নিও-ক্লাসিক্যাল তাত্ত্বিক পাঠ


ফেইড্রা নাটকটি নিও ক্লাসিজম ধরার নাটক বিশ্লেষণ

জঁ রাসিনের 'ফেইড্রা' (Phaedra) নাটকটি নিও-ক্লাসিক্যাল বা নব্য-ধ্রুপদী নাট্যরীতির একটি সার্থক নিদর্শন। নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো এই নাটকে যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. তিনটি ঐক্য (The Three Unities): নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সময়, স্থান এবং ক্রিয়ার ঐক্য বজায় রাখা।

  • সময়ের ঐক্য (Unity of Time): রাসিন এই নাটকে সময়ের ঐক্য কঠোরভাবে মেনে চলেছেন; নাটকের পুরো ঘটনাপ্রবাহ মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়।
  • স্থানের ঐক্য (Unity of Place): নাটকের ঘটনাবলি মূলত ট্রোজেনের রাজপ্রাসাদ বা তার আশেপাশেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা স্থানের ঐক্যের আদর্শ উদাহরণ।
  • ক্রিয়ার ঐক্য (Unity of Action): নাটকের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ফেইড্রার অনিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং তার করুণ পরিণতি। যদিও এরিসিয়ার কাহিনী একটি উপকাহিনী (subplot) হিসেবে আসে, তবে তা মূল কাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

২. সত্য প্রতীয়মানতা (Verisimilitude): নিও-ক্লাসিক্যাল তত্ত্বে নাটককে বাস্তবসম্মত বা "সত্যের মতো" হতে হয়।

  • রাসিন গ্রিক পুরাণ থেকে কাহিনী নিলেও মঞ্চে দেবতাদের সরাসরি উপস্থিতি বাদ দিয়েছেন এবং ঘটনাগুলোকে বাস্তব জীবনের উপযোগী করে তুলে ধরেছেন।
  • নাটকের অতিপ্রাকৃত উপাদান যেমন সমুদ্র দানবের আক্রমণ সরাসরি মঞ্চে না দেখিয়ে বর্ণনার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, কারণ মঞ্চে এমন দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা কঠিন।

৩. সমীচীনতা বা মার্জিত আচরণ (Decorum): নাটকের চরিত্রগুলোকে তাদের সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী আচরণ করতে হয়। ফেইড্রা নাটকে রাজকীয় চরিত্রগুলোর (থিসিয়াস, ফেইড্রা, হিপোলিটাস) মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক অবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চরিত্রগুলো সাধারণ মানুষের বদলে আভিজাত্য ও সার্বজনীন মানবিক সংকটের প্রতিনিধিত্ব করে।

৪. বিশুদ্ধ ট্র্যাজেডি (Purity of Type): নিও-ক্লাসিক্যাল নিয়ম অনুযায়ী ট্র্যাজেডি এবং কমেডিকে মিশ্রিত করা যাবে না। 'ফেইড্রা' একটি বিশুদ্ধ ট্র্যাজেডি যেখানে চরিত্রগুলো উচ্চবংশীয় বা অভিজাত সমাজ থেকে আসা। এই নাটকের পরিণতি অত্যন্ত করুণ এবং এর ভাষা উচ্চমার্গের কাব্যিক শৈলীতে রচিত।

৫. বিশ্বস্ত সহচর বা কনফিড্যান্ট (Confidants) এর ব্যবহার: নিও-ক্লাসিক্যাল তত্ত্বে মঞ্চে একা কথা বলা (soliloquy) বা কোরাসের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে প্রধান চরিত্রদের মনের কথা বলার জন্য 'কনফিড্যান্ট' বা বিশ্বস্ত সহচর রাখা হতো। রাসিনের এই নাটকেও আমরা দেখি:

  • ফেইড্রার সাথে রয়েছে ইন্যান
  • হিপোলিটাসের সাথে রয়েছে থেরামেনস
  • এরিসিয়ার সাথে রয়েছে ইসিমিন

৬. নৈতিক উদ্দেশ্য (Purpose of Drama): নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আনন্দ প্রদানের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা দেওয়া। রাসিন দেখিয়েছেন কীভাবে অনিয়ন্ত্রিত এবং অনৈতিক আবেগ (ফেইড্রার তার সৎ ছেলের প্রতি প্রেম) ধ্বংস ডেকে আনে। নাটকের শেষে অপরাধী বা পাপী চরিত্রের শাস্তি এবং একটি নৈতিক শৃঙ্খলার প্রতিফলন ঘটে।

 

পরিশেষে বলা যায়, জঁ রাসিন 'ফেইড্রা' নাটকে নিও-ক্লাসিক্যাল রীতির প্রতিটি নিয়ম—তিনটি ঐক্য থেকে শুরু করে কনফিড্যান্টের ব্যবহার পর্যন্ত—অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অনুসরণ করেছেন, যা একে নিও-ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের একটি আদর্শ উদাহরণে পরিণত করেছে।

 

 

Phaedra – ফেইড্রা

নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও ফেড্রা তার সৎসন্তান হিপোলিটাসকে ভালোবাসে। যদিও সে সম্পূর্ণভাবে জানে যে এই ভালোবাসা ভুল, তবুও সে এটিকে প্রতিরোধ করতে অক্ষম। ফেড্রার অন্তর্দ্বন্দ্বের উপরই রাসিন মূলত গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ভালো ও মন্দের সংঘাত নিয়ে রচিত অধিকাংশ নাটকে দেখানো হয়েছে যে সৎ শক্তি কোনো বাহ্যিক অশুভ শক্তির কাছে অসহায়, অথবা কোনো ভুল সিদ্ধান্তের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির শিকার। ফেড্রা নাটকে ভালো ও মন্দ একই ব্যক্তিত্বের মধ্যেই আবদ্ধ। এখানেই নাটকটির শক্তি নিহিত, কারণ এটি এমন এক নারীকে দেখায় যে নৈতিক বিশ্বাসে দৃঢ়, কিন্তু অযৌক্তিক আবেগ তার মানসিক শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। যেহেতু সংঘাতটি মূলত অভ্যন্তরীণ, তাই রাসিনের খুব বেশি বাহ্যিক ঘটনার প্রয়োজন হয়নি। নাটকের প্রথম অঙ্কে প্রকাশ পায় যে ফেড্রা দীর্ঘদিন ধরে হিপোলিটাসকে ভালোবাসে। তার অন্তর্দহন তাকে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়, যাতে সে তার নৈতিক সততা বিসর্জন না দেয়। তবে তার স্বামী থিসিউস মারা গেছে—এই সংবাদ তাকে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকে বিরত রাখে। ফেড্রার সেবিকা ও সঙ্গী ওয়েনোনে তাকে বোঝায় যে এখন হিপোলিটাসকে ভালোবাসা আর লজ্জার বিষয় নয়। ফেড্রা হিপোলিটাসের কাছে নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে, কিন্তু সে ঘৃণার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায়। নিজের এই সাহসী আচরণের জন্য ফেড্রা লজ্জা ও হতাশায় ভরে ওঠে। ওয়েনোনে তার আশাকে আবার জাগিয়ে তোলে, কিন্তু থিসিউস যে শুধু জীবিতই নয় বরং ট্রোজেনে ফিরে এসেছে—এই সংবাদে তার সব আশা ভেঙে পড়ে। ফেড্রাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়। হিপোলিটাস তার ভালোবাসার কথা জেনে গেছে—এ অবস্থায় সে কীভাবে তার স্বামীকে তার ছেলের সামনে অভ্যর্থনা জানাবে? তার তড়িঘড়ি চলে যাওয়া সন্দেহের সৃষ্টি করে। তার প্রভুকে বাঁচানোর জন্য ওয়েনোনে হিপোলিটাসের বিরুদ্ধে ফেড্রাকে প্রলুব্ধ করার অভিযোগ আনে। থিসিউস হিপোলিটাসকে অভিশাপ দেয় এবং নির্বাসিত করে। ফেড্রা যখন থিসিউসকে সত্য বলতে যাচ্ছিল, তখন সে অনিচ্ছাকৃতভাবে জানতে পারে যে হিপোলিটাস আরিসিয়াকে ভালোবাসে। তার ঈর্ষা তাকে সেই সত্য প্রকাশ করা থেকে বিরত রাখে, যা হিপোলিটাসের জীবন রক্ষা করতে পারত। হিপোলিটাস সঙ্গে সঙ্গেই চলে যায়। একটি সমুদ্রদানব হিপোলিটাসের ঘোড়াগুলোকে ভয় পাইয়ে দেয় এবং সে টেনে হিঁচড়ে মৃত্যুর দিকে চলে যায়। ওয়েনোনে আত্মহত্যা করে। শোক, অনুশোচনা ও আত্মঘৃণায় ভরা ফেড্রা বিষ পান করে। তবে মৃত্যুর আগে সে থিসিউসের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করে। এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে ফেড্রা নাটকে চরিত্রগুলোর সম্পর্ক জটিল, কিন্তু বাহ্যিক ঘটনাপ্রবাহ তুলনামূলকভাবে সরল। কাহিনির জটিলতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ মূলত এজন্য যে এগুলো চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রবল আবেগ সৃষ্টি করে। প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মূল কারণ হলো হিপোলিটাসের প্রতি ফেড্রার নিয়ন্ত্রণহীন আকর্ষণ। এই আবেগই নাটকের সব চরিত্রের জীবনে দুর্ভোগ ডেকে আনে। রাসিন কাহিনি ও চরিত্রের মধ্যে শক্তিশালী বৈপরীত্য ব্যবহার করেছেন। আরিসিয়া ও হিপোলিটাসের নিষ্পাপ প্রেমকে ফেড্রার অবৈধ প্রেমের বিপরীতে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি জটিলতা এমন এক ঘটনার শৃঙ্খল শুরু করে যা অবশ্যম্ভাবীভাবে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। এখানে কোনো অপ্রয়োজনীয় দৃশ্য নেই। রাসিন অপ্রয়োজনীয় কোনো বিবরণ ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা অর্জন করেছেন। রাসিন প্রায় সম্পূর্ণভাবেই নাটকের নব্যধ্রুপদী আদর্শ অনুসরণ করেছেন। সময়ের ঐক্য এখানে স্পষ্টভাবে রক্ষা করা হয়েছে। ঘটনাপ্রবাহ প্রায় পুরোপুরি ফেড্রার আবেগ ও তার পরিণতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। রাসিন তার নাটকটি ইউরিপিদিসের ‘হিপোলিটাস’ অবলম্বনে লিখলেও তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন।

 

জ্যাঁ রসিন রচিত ফেইড্রা নাটকটি কেন নব্যধ্রুপদী বা নিওক্লাসিক নাটক

জঁ রাসিন রচিত 'ফেইড্রা' নাটকটি নিও-ক্লাসিক্যাল রীতির একটি সার্থক প্রয়োগ। এর কারণগুলো হলো:

১. তিনটি ঐক্য (The Three Unities): নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকের প্রধান শর্ত হলো সময়, স্থান এবং ক্রিয়ার ঐক্য বজায় রাখা।

  • সময়ের ঐক্য (Unity of Time): নাটকের পুরো ঘটনাপ্রবাহ মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়।
  • স্থানের ঐক্য (Unity of Place): কাহিনীর ঘটনাস্থল সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও তা ট্রোজেনের (Troezen) রাজপ্রাসাদ বা তার আশেপাশেই সীমাবদ্ধ থাকে।
  • ক্রিয়ার ঐক্য (Unity of Action): নাটকের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ফেইড্রার অনিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং তার করুণ পরিণতি। এরিসিয়ার কাহিনী একটি উপকাহিনী (subplot) হলেও তা মূল ঘটনার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

২. সত্য প্রতীয়মানতা (Verisimilitude): নিও-ক্লাসিক্যাল রীতি অনুযায়ী নাটককে বাস্তবসম্মত বা "সত্যের মতো" হতে হয়। রাসিন তার নাটকে দেবতাদের দৃশ্যমান চরিত্র হিসেবে মঞ্চে আনেননি। এমনকি সমুদ্র দানবের মতো অতিপ্রাকৃত উপাদানগুলোকে সরাসরি মঞ্চে না দেখিয়ে বর্ণনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন, যাতে নাটকটি সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়।

৩. সমীচীনতা বা মার্জিত আচরণ: নাটকের চরিত্রগুলোর সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী তাদের আচরণ এবং ভাষা নির্ধারিত হয়। ফেইড্রা নাটকে চরিত্রগুলোর শারীরিক গঠনের চেয়ে তাদের মনস্তাত্ত্বিক এবং নৈতিক অবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে রাজকীয় চরিত্রগুলোর রাজকীয় মর্যাদা এবং উচ্চমার্গের কাব্যিক শৈলী ব্যবহার করা হয়েছে।

৪. বিশ্বস্ত সহচর বা কনফিড্যান্ট (Confidants) এর ব্যবহার: নিও-ক্লাসিক্যাল তত্ত্বে মঞ্চে একা কথা বলা (soliloquy) বা কোরাসের ব্যবহারকে অবাস্তব মনে করা হতো। এর পরিবর্তে প্রধান চরিত্রদের মনের কথা বলার জন্য 'কনফিড্যান্ট' বা বিশ্বস্ত সহচর ব্যবহার করা হয়। যেমন:

  • ফেইড্রার জন্য ইন্যান
  • হিপোলিটাসের জন্য থেরামেনস
  • এরিসিয়ার জন্য ইসিমিন

৫. নৈতিক শিক্ষা (The Purpose of Drama): নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি দর্শকদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া। রাসিন ফেইড্রার মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে অনিয়ন্ত্রিত এবং অনৈতিক আবেগ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় এবং শেষে অপরাধী চরিত্রের শাস্তি নিশ্চিত হয়।

পরিশেষে বলা যায়, ফ্রেঞ্চ একাডেমির নির্ধারিত সব কঠোর নিয়ম—তিনটি ঐক্য থেকে শুরু করে কনফিড্যান্টের ব্যবহার পর্যন্ত—রাসিন তার 'ফেইড্রা' নাটকে নিখুঁতভাবে পালন করেছেন, যা একে একটি আদর্শ নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকে পরিণত করেছে।

 

সত্যপ্রতীয়মানতা (Verisimilitude) কি? জঁরাসিনের ফেইড্রা নাটক বিশ্লেষণ

নব্য-ধ্রুপদী বা নিও-ক্লাসিক্যাল নাট্যতত্ত্বে 'সত্য প্রতীয়মানতা' (Verisimilitude) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ধারণা, যার মূল অর্থ হলো নাটককে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে তা দর্শকদের কাছে "সত্যের মতো" বা বাস্তবসম্মত মনে হয়। জঁ রাসিনের 'ফেইড্রা' নাটকে এই তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

 

নিও-ক্লাসিক্যাল তাত্ত্বিকদের মতে, সত্য প্রতীয়মানতার তিনটি প্রধান দিক রয়েছে:

১. বাস্তবতা (Reality): নাট্যকারকে এমন ঘটনা বা চরিত্র বর্জন করতে হয় যা বাস্তব জীবনে ঘটা অসম্ভব।

২. নৈতিকতা (Morality): নাটককে কেবল জীবনের নকল হলে চলে না, বরং সেখানে একটি আদর্শ নৈতিক কাঠামো থাকতে হয় যেখানে অপরাধের শাস্তি এবং সততার জয় নিশ্চিত করা হয়।

৩. সার্বজনীনতা (Generality/Abstraction): চরিত্রের ব্যক্তিগত তুচ্ছ খুঁটিনাটির চেয়ে তাদের সার্বজনীন মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

এই তত্ত্বের অধীনে আরও কিছু নিয়ম যুক্ত ছিল, যেমন—মঞ্চে সহিংসতা না দেখানো, কোরাস বা একাকী কথা বলা (soliloquy) বর্জন করা এবং তিনটি ঐক্য বজায় রাখা।

 

রাসিন তার 'ফেইড্রা' নাটকে সত্য প্রতীয়মানতা রক্ষার জন্য অত্যন্ত সচেতন ছিলেন, যা নিচের বিষয়গুলোর মাধ্যমে ফুটে ওঠে:

১. দেবতাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি বর্জন: রাসিন তার নাটকের কাহিনী গ্রিক পুরাণ থেকে নিলেও ধ্রুপদী গ্রিক নাটকের মতো দেবতাদের দৃশ্যমান চরিত্র হিসেবে মঞ্চে আনেননি। অলৌকিক শক্তির বদলে তিনি চরিত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ মানসিক দ্বন্দ্ব এবং মানবিক আবেগের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যা নাটকটিকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

২. মঞ্চে সহিংসতা বর্জন ও বর্ণনার ব্যবহার: নিও-ক্লাসিক্যাল নিয়ম অনুযায়ী মঞ্চে সহিংস দৃশ্য দেখানো বিশ্বাসযোগ্য নয়। রাসিন তার নাটকে হিপোলিটাসের করুণ মৃত্যু সরাসরি মঞ্চে না দেখিয়ে পঞ্চম অংকের ষষ্ঠ দৃশ্যে থেরামেনস-এর বর্ণনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমনকি সমুদ্র দানবের মতো অতিপ্রাকৃত উপাদানটিও মঞ্চের বাইরে রাখা হয়েছিল যাতে নাটকের বাস্তবতা নষ্ট না হয়।

৩. কনফিড্যান্ট বা বিশ্বস্ত সহচরের ব্যবহার: মঞ্চে একা একা কথা বলা (soliloquy) অবাস্তব মনে করা হতো। রাসিন কোরাস বর্জন করে প্রধান চরিত্রগুলোর জন্য 'কনফিড্যান্ট' বা বিশ্বস্ত সহচর দিয়েছেন (যেমন: ফেইড্রার জন্য ইন্যান, হিপোলিটাসের জন্য থেরামেনস)। চরিত্রগুলো এই সহচরদের কাছেই তাদের মনের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করে, যা দর্শকদের সামনে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে তাদের অন্তদ্বন্দ্ব তুলে ধরে।

৪. নৈতিক শৃঙ্খলার প্রতিফলন: সত্য প্রতীয়মানতার নৈতিক দিকটি রাসিন ফেইড্রার পরিণতির মাধ্যমে দেখিয়েছেন। ফেইড্রা তার অবৈধ প্রেমের জন্য তীব্র অনুশোচনায় ভোগেন এবং শেষ পর্যন্ত বিষ পান করে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধ স্বীকার করেন। অপরাধী চরিত্রের এই শাস্তি এবং রাজার কাছে সত্যের প্রকাশ নাটকের নৈতিক উদ্দেশ্য সফল করে।

৫. তিনটি ঐক্য (The Three Unities): রাসিন সত্য প্রতীয়মানতা বজায় রাখতে সময়ের ঐক্য (কাহিনীর ঘটনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হওয়া) এবং স্থানের ঐক্য (ট্রোজেনের রাজপ্রাসাদ) কঠোরভাবে মেনে চলেছেন। এটি কাহিনীর গঠনকে আরও সংহত এবং বাস্তবমুখী করেছে।

 

পরিশেষে বলা যায়, রাসিনের 'ফেইড্রা' কেবল একটি ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি নব্য-ধ্রুপদী নাট্যতত্ত্বের এমন এক শৈল্পিক প্রয়োগ যেখানে সত্য প্রতীয়মানতার নিয়মাবলি চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও নৈতিক সংকটকে আরও জোরালো করে তুলেছে।

 

নৈতিকতা দিয়ে ফেইড্রার অন্তদ্বন্দ্ব ব্যাখ্যা

জঁ রাসিনের 'ফেইড্রা' নাটকের মূল ভিত্তি হলো ফেইড্রার অন্তদ্বন্দ্ব, যেখানে তার উচ্চতর নৈতিক বোধ এবং অদম্য অবৈধ আবেগ একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ফেইড্রার এই মানসিক সংগ্রামকে নৈতিকতার আলোকে নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

 

১. নৈতিক চেতনা বনাম অবৈধ আবেগ: ফেইড্রা পুরোপুরি সচেতন যে তার সৎ ছেলে হিপোলিটাসের প্রতি তার ভালোবাসা নৈতিকভাবে ভুল এবং সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে 'পাপ'। সে অত্যন্ত শক্তিশালী নৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী একজন নারী, কিন্তু তার ইচ্ছাশক্তি এই যুক্তিহীন আবেগের কাছে পরাজিত হয়। এই বৈপরীত্যই তার অন্তদ্বন্দ্বের প্রধান উৎস।

২. বিবেকের দংশন ও আত্ম-ঘৃণা: ফেইড্রা তার নিজের কামনাকে 'জঘন্য বাসনা' এবং নিজেকে 'পাপাচারী' হিসেবে গণ্য করে। সে হিপোলিটাসকে বলে যে, সে নিজেকে যতটা ঘৃণা করে, অন্য কেউ তাকে ততটা ঘৃণা করতে পারবে না। তার হাতের চেয়েও তার হৃদয় কলুষিত—এই বোধ তাকে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে।

৩. নৈতিক অখণ্ডতা রক্ষার চেষ্টা: নিজের 'মোরাল ইন্টিগ্রিটি' বা নৈতিক অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য ফেইড্রা নাটকের শুরুতেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সে চায়নি তার এই গোপন পাপের কথা কেউ জানুক এবং তার বংশের নামে কলঙ্ক লাগুক। সে এমনকি হিপোলিটাসকে নির্বাসনে পাঠিয়ে নিজের বিবেককে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়।

৪. সন্তানদের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা: ফেইড্রার অন্তদ্বন্দ্বের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ। সে ভয় পায় যে তার 'কলঙ্কমাখা নাম' তার সন্তানদের জন্য লজ্জার কারণ হবে এবং তার অপরাধের জন্য হয়তো একদিন তার সন্তানদেরও তিরস্কৃত হতে হবে। এই মাতৃত্বসুলভ নৈতিক উদ্বেগ তাকে আরও বেশি অস্থির করে তোলে।

৫. ঐশ্বরিক অভিশাপ ও অসহায়ত্ব: ফেইড্রা মনে করে সে দেবী ভেনাসের অভিশাপের শিকার। তার এই অবৈধ আবেগ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তবুও তার নৈতিক বিবেক তাকে ক্ষমা করতে পারে না। এই অসহায়ত্ব তাকে একজন ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত করে, যে একই সাথে প্রশংসনীয় (তার নৈতিক বোধের জন্য) এবং করুণার পাত্রী (তার নিয়ন্ত্রনহীন আবেগের জন্য)।

৬. নৈতিক শিক্ষা ও পরিণতি: নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকের নিয়ম অনুযায়ী, অপরাধী চরিত্রের শাস্তি হওয়া অনিবার্য। ফেইড্রা শেষ পর্যন্ত বিষ পান করে নিজের জীবন বিসর্জন দেয় এবং রাজার কাছে হিপোলিটাসের নির্দোষিতা স্বীকার করে সত্য প্রকাশ করে। এই স্বীকারোক্তি এবং অনুশোচনার মাধ্যমেই সে নৈতিকভাবে দর্শকদের কাছে নিজেকে কিছুটা হলেও পরিশুদ্ধ করতে সক্ষম হয়।

পরিশেষে, ফেইড্রার অন্তদ্বন্দ্ব মূলত বিবেকের যুক্তি এবং হৃদয়ের তাড়নার এক করুণ যুদ্ধ, যেখানে নৈতিকতার দংশন তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

 

জঁ রাসিনের 'ফেইড্রা' নাটকে নব্য-ধ্রুপদী বা নিও-ক্লাসিক্যাল নাট্যরীতির কঠোর নিয়মাবলি (যেমন: তিনটি ঐক্য ও সমীচীনতা) কীভাবে ফেইড্রার অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে আরও তীব্রতর করে তুলেছে?

 

জঁ রাসিনের 'ফেইড্রা' নাটকে নিও-ক্লাসিক্যাল বা নব্য-ধ্রুপদী নাট্যরীতির কঠোর নিয়মাবলি কেবল যান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা ছিল না, বরং এগুলো ফেইড্রার অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে আরও ঘনীভূত ও তীব্রতর করার শৈল্পিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কীভাবে এই নিয়মগুলো ফেইড্রার সংকটকে আরও গভীর করেছে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. তিনটি ঐক্যের (The Three Unities) প্রভাব:

  • সময়ের ঐক্য (Unity of Time): নাটকের পুরো ঘটনাপ্রবাহ মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়। এই সংক্ষিপ্ত সময় ফেইড্রার জন্য একটি 'প্রেশার কুকার' পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সে তার অবৈধ আবেগকে বিচার-বিশ্লেষণ করার বা তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো অবকাশ পায় না। থিসিয়াসের হঠাৎ ফিরে আসার সংবাদ যখন আসে, তখন সময়ের এই সীমাবদ্ধতা তার সংকটকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়, কারণ সে তখন আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে তার পাপের জালে আরও জড়িয়ে পড়ে।
  • স্থানের ঐক্য (Unity of Place): কাহিনীর ঘটনাস্থল ট্রোজেনের রাজপ্রাসাদে সীমাবদ্ধ থাকায় ফেইড্রা সবসময় তার সংকটের কেন্দ্রবিন্দুর (হিপোলিটাস এবং পরবর্তীতে থিসিয়াস) কাছাকাছি থাকতে বাধ্য হয়। পালানোর কোনো পথ না থাকায় তার মানসিক যাতনা একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
  • ক্রিয়ার ঐক্য (Unity of Action): নাটকের পুরো মনোযোগ ফেইড্রার অনিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং তার করুণ পরিণতির ওপর নিবদ্ধ। কোনো পার্শ্ব-কাহিনী বা উপকাহিনী (subplot) মূল দ্বন্দ্ব থেকে দর্শকদের মনোযোগ সরায় না, ফলে ফেইড্রার অন্তদ্বন্দ্বই নাটকের একমাত্র এবং প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়।

২. সমীচীনতা বা মার্জিত আচরণের (Decorum) ভূমিকা: নিও-ক্লাসিক্যাল রীতি অনুযায়ী চরিত্রগুলোকে তাদের সামাজিক মর্যাদা ও নৈতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আচরণ করতে হয়।

  • সামাজিক মর্যাদা বনাম অবৈধ আকাঙ্ক্ষা: ফেইড্রা একজন রানী এবং উচ্চবংশীয় নারী। তার 'সমীচীনতা'র বোধ তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে, তার সৎ ছেলের প্রতি আকর্ষণ কেবল একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়, বরং এটি তার রাজকীয় মর্যাদা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
  • ভব্যতা রক্ষার যাতনা: নিজের 'নৈতিক অখণ্ডতা' বজায় রাখার প্রবল ইচ্ছা এবং তার 'যুক্তিহীন আবেগ'-এর মধ্যে যে লড়াই, তা ডেকোরাম বা সমীচীনতার নিয়মের কারণেই আরও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। সে নিজেকে ঘৃণা করে কারণ সে জানে তার এই আচরণ রাজকীয় মর্যাদার সাথে খাপ খায় না।

৩. সত্য প্রতীয়মানতা ও কনফিড্যান্টের ব্যবহার:

  • নিও-ক্লাসিক্যাল তত্ত্বে মঞ্চে একা কথা বলা (soliloquy) অবাস্তব মনে করা হতো। এর বদলে রাসিন ইন্যান চরিত্রটিকে ফেইড্রার 'কনফিড্যান্ট' বা বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
  • ইন্যানের উপস্থিতির ফলে ফেইড্রা তার মনের গভীরতম গোপন কথাগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য হয়, যা তার ভেতরের দ্বন্দ্বকে দর্শকদের সামনে বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরে। ইন্যানের দেওয়া অনৈতিক পরামর্শগুলো ফেইড্রার নৈতিক সত্তাকে আরও বেশি দংশন করে এবং তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

৪. নৈতিক উদ্দেশ্য (Moral Purpose): নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকের লক্ষ্য ছিল নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা—যেখানে পাপের শাস্তি অনিবার্য। ফেইড্রার তীব্র অনুশোচনা, স্বীকারোক্তি এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা এই নৈতিক শৃঙ্খলারই প্রতিফলন। তার নৈতিক বোধ যতটা প্রবল ছিল, তার আবেগ ততটাই অদম্য ছিল, আর এই দুইয়ের সংঘর্ষই তাকে দর্শকদের কাছে একই সাথে 'প্রশংসনীয় এবং করুণার পাত্রী' করে তুলেছে।

পরিশেষে বলা যায়, রাসিন নিও-ক্লাসিক্যাল নিয়মগুলোকে এমনভাবে প্রয়োগ করেছেন যাতে ফেইড্রার বাহ্যিক ক্রিয়া সীমিত হলেও তার অভ্যন্তরীণ মানসিক ঝড় বা মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।

 

ইডিপাস নাটক ও ফেইড্রা নাটকের তুলনামূলক আলোচনা

জঁ রাসিনের 'ফেইড্রা' (Phaedra) নাটকটি মূলত গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিসের 'হিপোলিটাস'-এর ওপর ভিত্তি করে রচিত এবং এটি প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির আদর্শকে অনুসরণ করে। ইডিপাসের মতো ধ্রুপদী গ্রিক নাটকের সাথে নিও-ক্লাসিক্যাল ধারার ফেইড্রা নাটকের একটি তুলনামূলক আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. তিনটি ঐক্য (The Three Unities): ইডিপাস নাটকে সময়ের ঐক্য (এক দিনের ঘটনা) এবং স্থানের ঐক্য স্বাভাবিকভাবেই বজায় ছিল। রাসিন তার 'ফেইড্রা' নাটকে নিও-ক্লাসিক্যাল নিয়ম অনুযায়ী এই তিনটি ঐক্য (সময়, স্থান ও ক্রিয়া) অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলেছেন। ফেইড্রার পুরো ঘটনা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এবং একটি নির্দিষ্ট প্রাসাদের পটভূমিতে সম্পন্ন হয়।

২. দ্বন্দ্বের প্রকৃতি: ইডিপাসের মতো গ্রিক ট্র্যাজেডিতে চরিত্রগুলো প্রায়ই দেবতাদের ইচ্ছা বা অমোঘ ভাগ্যের হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু রাসিনের 'ফেইড্রা'-তে প্রধান দ্বন্দ্বটি চরিত্রের অভ্যন্তরীণ। এখানে ভালো এবং মন্দ একই ব্যক্তির চরিত্রের মধ্যে বিদ্যমান, যেখানে ফেইড্রার উচ্চতর নৈতিক বোধ তার অনিয়ন্ত্রিত আবেগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে।

৩. কোরাস বনাম কনফিড্যান্ট: ইডিপাসসহ গ্রিক নাটকগুলোতে 'কোরাস' একটি অপরিহার্য অংশ ছিল যা কাহিনীর ধারা বর্ণনা করত। নিও-ক্লাসিক্যাল তত্ত্বে কোরাসকে বাস্তবসম্মত মনে করা হতো না, তাই রাসিন কোরাসের পরিবর্তে 'কনফিড্যান্ট' বা বিশ্বস্ত সহচর চরিত্র (যেমন: ফেইড্রার জন্য ইন্যান) ব্যবহার করেছেন। এই চরিত্রগুলোর মাধ্যমেই প্রধান চরিত্ররা তাদের গোপন মানসিক যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করে।

৪. দেবতাদের উপস্থিতি: গ্রিক নাটকে দেবতারা প্রায়ই দৃশ্যমান চরিত্র হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু রাসিন তার নাটকে দৃশ্যমান দেবতাদের উপস্থিতি বর্জন করেছেন এবং অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোকে সরাসরি না দেখিয়ে বর্ণনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন, যাতে নাটকটি সাধারণ মানুষের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য (Verisimilitude) মনে হয়।

৫. সহিংসতার প্রদর্শন: ইডিপাস নাটকের মতো গ্রিক ট্র্যাজেডিতে বীভৎস দৃশ্য (যেমন ইডিপাসের নিজের চোখ উপড়ে ফেলা) মঞ্চের বাইরে ঘটত এবং দূতের মাধ্যমে বর্ণনা করা হতো। রাসিন নিও-ক্লাসিক্যাল নিয়ম মেনে মঞ্চে কোনো সহিংসতা দেখাননি; এমনকি হিপোলিটাসের মৃত্যুও মঞ্চে না দেখিয়ে 'থেরামেনস'-এর দীর্ঘ বর্ণনার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন।

৬. নৈতিক উদ্দেশ্য (Moral Purpose): নিও-ক্লাসিক্যাল নাটকের একটি প্রধান শর্ত ছিল নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা। ইডিপাসের কাহিনীতে ভাগ্যের প্রাধান্য থাকলেও, রাসিন 'ফেইড্রা' নাটকে দেখিয়েছেন যে অপরাধ বা অনৈতিক আবেগ কীভাবে ধ্বংস ডেকে আনে এবং শেষ পর্যন্ত অপরাধীর শাস্তি ও সত্যের জয় হয়।

 

পরিশেষে বলা যায়, ফেইড্রা নাটকটি গ্রিক ট্র্যাজেডির কাঠামো গ্রহণ করলেও রাসিন একে নিও-ক্লাসিক্যাল নিয়মের ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছেন, যেখানে অতিপ্রাকৃত উপাদানের চেয়ে মানবিক মনস্তত্ত্ব এবং নৈতিক শৃঙ্খলা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

 

 

তথ্যসূত্র

NEOCLASSICISM by Afrin Huda Mam

PHAEDRA by JEAN RACINE

Phaedra[Theatre an Introduction by Oscar Brockett].pdf

 

কোর্স শিক্ষক:

আফরিন হুদা, প্রভাষক, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

নোট:

মুহাম্মদ আল ইমরান, শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।