আমার কলেজ জীবনের কথা মনে পড়লেই প্রথমে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঢাকা উদ্যান সরকারি মহাবিদ্যালয়ের পরিচিত প্রাঙ্গণ। মোহাম্মদপুরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি শুধু আমার কাছে একটি কলেজ ছিল না; এটি ছিল আমার বেড়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে বইয়ের পাতার পাশাপাশি জীবনকেও পড়তে শিখেছি।
কলেজজীবনে শিক্ষকদের ভূমিকা আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয়। তাদের পাঠদান শুধু পরীক্ষার খাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা আমাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছেন এবং জীবনে ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। কোনো শিক্ষক হয়তো একটি ছোট্ট কথা বলেছেন, কোনো শিক্ষক হয়তো ভুল শুধরে দিয়েছেন, আবার কেউ হয়তো আমাদের প্রতিভাকে চিনে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন—এসব ছোট ছোট মুহূর্তই আজ বড় স্মৃতি হয়ে আছে। তাদের শাসন, স্নেহ, পরামর্শ ও উৎসাহ আমার ব্যক্তিত্ব গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
পড়াশোনার ক্ষেত্রেও কলেজজীবন ছিল শেখার এক দারুণ সময়। শ্রেণিকক্ষের নিয়মিত পাঠ, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা—সবকিছু মিলিয়ে একদিকে যেমন একাডেমিক জ্ঞান অর্জন করেছি, অন্যদিকে শিখেছি সময়কে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, দায়িত্ব নিতে হয় এবং নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় হয়তো পড়াশোনার চাপ ছিল, পরীক্ষার দুশ্চিন্তা ছিল; কিন্তু সেই ব্যস্ততার মধ্যেও ছিল এক ধরনের আনন্দ, যা আজ ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
আমার কলেজজীবনের আরেকটি বড় সৌন্দর্য ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশ। সংস্কৃতিচর্চার প্রতি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজের বিভিন্ন আয়োজন ছিল নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ। গান, আবৃত্তি, অভিনয়, বিতর্ক কিংবা অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—এসব আয়োজন আমাদের শুধু বিনোদন দেয়নি, বরং আত্মবিশ্বাসী হতে শিখিয়েছে। সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের সৃজনশীলতা আবিষ্কার করেছি, একে অন্যের প্রতিভাকে সম্মান করতে শিখেছি এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।
ক্রীড়া আয়োজনও ছিল কলেজজীবনের অন্যতম আকর্ষণ। মাঠের প্রতিযোগিতা, বন্ধুদের উৎসাহ, জয়-পরাজয়ের উত্তেজনা—সব মিলিয়ে ক্রীড়া আমাদের কলেজজীবনে প্রাণ এনে দিত। খেলাধুলা আমাদের শিখিয়েছে প্রতিযোগিতা মানে শুধু জয় নয়; পরাজয়কে মেনে নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোও একটি বড় শিক্ষা। দলগত খেলায় একসঙ্গে লড়াই করার অভিজ্ঞতা বন্ধুত্বকে আরও গভীর করেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, ঢাকা উদ্যান সরকারি মহাবিদ্যালয় আমাকে শুধু একটি সার্টিফিকেটের জন্য প্রস্তুত করেনি; আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছে। এখানকার শিক্ষক, সহপাঠী, বড়-ছোট ভাইবোন, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া আয়োজন—সবকিছু মিলেই আমার কলেজজীবনের গল্প।
জীবনের পথে আমরা অনেক দূরে চলে যাই। নতুন মানুষ আসে, নতুন প্রতিষ্ঠান আসে, নতুন দায়িত্ব আসে। কিন্তু জীবনের কিছু জায়গা কখনো পুরোনো হয় না। ঢাকা উদ্যান সরকারি মহাবিদ্যালয় আমার কাছে তেমনই একটি জায়গা—যেখানে আমার তারুণ্যের অনেকটা সময়, অসংখ্য হাসি-কান্না, বন্ধুত্ব, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং শেখার গল্প জমা হয়ে আছে।
আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, মনে হয়—সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু স্মৃতিগুলো থেকে যায়। আর সেই স্মৃতির পাতায় ঢাকা উদ্যান সরকারি মহাবিদ্যালয় সবসময়ই আমার কাছে ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও গর্বের একটি নাম হয়ে থাকবে।
মুহাম্মদ আল ইমরান
৬ষ্ঠ ব্যাচ, ঢাকা উদ্যান সরকারি মহাবিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
