প্রাচীন মিশরীয় থিয়েটার

 


প্রাচীন মিশরে আনুমানিক ৫০০০ বছর আগেই নাটক এক সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করেছিল। পিরামিড ও প্রাচীন অভিজাতদের কবরভূমিতে আবিষ্কৃত পিরামিড টেক্সট্‌স (Pyramid Texts) থেকে মিশরের প্রাচীন নাট্যপ্রচেষ্টা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়, যেখানে প্রায় ৫৫টির মত নাটকের রূপরেখা ও মঞ্চ নির্দেশিকা লিখিত রয়েছে।


১. মিশরীয় নাটকের প্রধান শ্রেণীবিভাগ

পিরামিড টেক্সট ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী প্রাচীন মিশরীয় নাটককে মূলত ৪টি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:

  • রাজা বা অভিজাতদের স্বর্গারোহণ ও পুনর্জীবন কাহিনী: এই ধারার নাটকে মৃত রাজাকে দেবরূপ ওসিরিস এবং জীবিত রাজাকে ওসিরিসের পুত্র হোরাস মনে করে তৎকালীন রাজা বা পুরোহিতগণ অভিনয় করতেন।
  • রাজ্যাভিষেক উৎসব নাটক: খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ অব্দ নাগাদ ফারাওদের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে বা দীর্ঘ শাসনকালের স্মরণে ‘হেব-সেড’ উৎসব নাটক অনুষ্ঠিত হতো।
  • রোগ নিরাময় ও ভূত তাড়ানোর নাট্যানুষ্ঠান: পৌরাণিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে রোগ সারানো ও ভূত তাড়াতে এগুলো প্রদর্শিত হতো। যেমন—দেবী আইসিস কীভাবে যাদুবিদ্যার মাধ্যমে বিচ্ছু কামড়ানো হোরাসকে সুস্থ ও কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস প্রদান করেছিলেন।
  • প্যাশান প্লে (Passion Play): এটি ছিল মিশরীয় নাটকের বিবর্তনের শেষ যুগের উদাহরণ, যার মধ্যে তীব্র নাটকীয় দ্বন্দ্ব, অ্যাকশন এবং দেবোপম চরিত্র বিদ্যমান ছিল।

 

২. আবাইডোস প্যাশান প্লে

মিশরীয় থিয়েটারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হলো আবাইডোস প্যাশান প্লে বা ওসিরিস প্যাশান প্লে।

  • পৌরাণিক কাহিনীর পটভূমি: শস্য, উর্বরতা ও জীবন-মৃত্যুর দেবতা ওসিরিসকে তাঁর ভাই সেট (Set - মৃত্যুর প্রতীক) হত্যা করে কফিনে ভরে নীলনদে ভাসিয়ে দেন এবং পরে তাঁর দেহ ১৪ টুকরো করে ছড়িয়ে দেন। ওসিরিসের স্ত্রী আইসিস ও পুত্র হোরাস সেই বিচ্ছিন্ন অংশগুলো একত্র করে ওসিরিসকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং হোরাস যুদ্ধে সেটকে পরাজিত করেন।

 

চরিত্র সমূহ

ওসিরিস: বীরচরিত্র। তিনি ছিলেন একাধারে শস্যদেবতা, র্যদেবতা, উর্বরতার দেবতা এবং জীবন ও মৃত্যুর দেবতা। তার জন্ম হয়েছিল আকাশ ও পৃথিবীর মিলনে।

আইসিস: ওসিরিসের ভগ্নী এবং স্ত্রী।

সেট: ওসিরিসের শত্রু এবং তার ভ্রাতা।

হোরাস: ওসিরিস ও আইসিসের পুত্র।

 

Story: ওসিরিসের সাথে সেটের যুদ্ধ হয়। সেট জয়ী হয়। সেট কফিনে পেরেক মেরে তার ভ্রাতাকে নীলনদে ভাসিয়ে দিলে। আইসিস ওসিরিসকে খুঁজে বেরাচ্ছেন। তখন জন্ম হলো পুত্র হোরাস। সে ছিল সৌরদেবতা। সেট তার ভাইয়ের দেহ ১৪ টুকরো করলো। অহিসিস ও হোরাস দেহের সবগুলো টুকরো এক করলো। আইসিস তার ডানা দিয়ে ওসিরিসতে জীবিত করে তাখন সে দেবতা ওসিরিস রূপে পুনরুজ্জীবিত হন।

 

ওসিরিস প্যাশান প্লে’র ১১টি পর্যায়

1.   রাজপ্রাসাদ থেকে শোভাযাত্রা: রাজপ্রাসাদের সম্মুখভাগ থেকে পুরোহিত, রাজন্যবর্গ, অভিনেতা, সাধারণ নাগরিক ও কৃষকদের সমবেত অংশগ্রহণে এক বিশাল আড়ম্বরপূর্ণ শোভাযাত্রার মাধ্যমে নাটকের সূচনা হতো।

2.   ওসিরিসের “তরণী”—অনুচর বেষ্টিত: শোভাযাত্রার কেন্দ্রস্থলে থাকত ওসিরিসের অলংকৃত ও সুদৃশ্য পবিত্র 'তরণী' (নৌকা), যা অনুচরদের দ্বারা সুরক্ষিত হয়ে এগিয়ে চলত।

3.   নৌকা—আক্রমণ—যুদ্ধ: শোভাযাত্রা কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর শত্রুপক্ষ ওসিরিসের নৌকা আক্রমণ করত এবং পথেই উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হতো।

4.   ওসিরিসের পুনরুজ্জীবন—উল্লাস: প্রথম দফার সংঘাত শেষে মন্দির প্রাঙ্গণে ওসিরিসের সাময়িক পুনরুজ্জীবনের দৃশ্য দেখানো হতো এবং উপস্থিত জনতা উল্লাসে মেতে উঠত।

5.   আবার কবরে অন্তর্ধান—বিলাপ—ক্রন্দন: উল্লাসের পরপরই ওসিরিস আবার কবরে অন্তর্হিত হতেন (বা নিহত হতেন), এবং দর্শকেরা শোকে বিহ্বল হয়ে বিলাপ ও ক্রন্দন শুরু করত।

6.   যুদ্ধ: ওসিরিসের অনুচরদের সাথে শত্রু সেট ও তার বাহিনীর পুনরায় যুদ্ধ সংঘটিত হতো।

7.   ওসিরিসের অনুসন্ধান—বাধা ও যুদ্ধ: সেট কর্তৃক ওসিরিসের দেহ টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দেওয়ার পর, দেবী আইসিস ও অনুচরেরা তিন দিন ধরে সেই বিচ্ছিন্ন দেহাংশ খুঁজতে থাকতেন এবং অনুসন্ধানের পথে শত্রুর বাধার মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন।

8.   দেহাংশের পুনঃপ্রাপ্তি—উল্লাস: দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ওসিরিসের বিচ্ছিন্ন ১৪টি দেহাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হলে সকলের মাঝে পুনরায় আনন্দের বন্যা বয়ে যেত।

9.    শবানুগমন—শোক: উদ্ধারকৃত দেহাবশেষ অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে মন্দির থেকে দেবমাইল দূরে অবস্থিত ওসিরিসের সমাধির দিকে নিয়ে যাওয়া হতো এবং অনুগামীরা গভীর শোক পালন করত।

10.  ওসিরিস পুত্র হোরাসের সঙ্গে “সেট”-এর যুদ্ধ—হোরাসের জয়: সমাধিক্ষেত্রে পৌঁছানোর পর ওসিরিসের পুত্র হোরাসের সাথে পিতৃহত্যাকারী সেটের চূড়ান্ত যুদ্ধ হতো; এতে হোরাস বিজয়ী হতো এবং সেট ও তার বাহিনীকে নিধন করা হতো।

11.  ওসিরিসের পুনরাবির্ভাব: চূড়ান্ত জয়ের পর ওসিরিস পাতালপুরীর অধিপতি ও দেবরূপে পুনরুজ্জীবিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করতেন; অতঃপর শোভাযাত্রা রাজপ্রাসাদে ফিরে আসত এবং সেখানে ওসিরিসের জীবনের গৌরবোজ্জ্বল পর্বগুলো অভিনয়ের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হতো

 

  • প্রথম নাট্যপরিচালক: খ্রিস্টপূর্ব ১৮৮৭ থেকে ১৮৪১ অব্দের মধ্যে রাজা তৃতীয় মুজারটসেনের (King Usertsen III) রাজকর্মচারী আই-খারু-নেফার্ট (I-Kher-nefert) আবাইডাসে এই নাটকের নির্দেশনা দেন এবং পাথরে খোদাই করে মঞ্চায়ন ও অভিনয় সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ রেখে যান। তিনি নিজে হোরাসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

 

৩. মঞ্চায়ন, অঙ্গসজ্জা ও অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য

মিশরীয় থিয়েটারের উপস্থাপন রীতি ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও উৎসবমুখর:

  • বাস্তব পটভূমি ও মঞ্চ: নাটকের জন্য কোনো কৃত্রিম বা স্থায়ী নাট্যগৃহ ছিল না। রাজপ্রাসাদ, রাজপথ, মন্দির, নীল নদ ও প্রকৃত কবরভূমিকেই অভিনয়ের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
  • প্রপস (Stage Props) ও পোশাক: ওসিরিসের সুদৃশ্য তরণী (নৌকা), অলংকার ও জমকালো পোশাক ব্যবহৃত হতো।
  • উৎসবের ব্যাপ্তি: আবাইডাসের এই নাট্যানুষ্ঠান প্রায় ১৮ দিন ধরে চলত, যেখানে পুরোহিত, রাজন্যবর্গ, অভিনেতা এবং সাধারণ কৃষক অংশগ্রহণ করতেন।
  • বাস্তবধর্মী অভিনয় ও যুদ্ধ: শোভাযাত্রার সময় কৃত্রিম ও প্রকৃত যুদ্ধের অভিনয় হতো, যেখানে অভিনেতারা আহত হতেন এবং যুদ্ধবন্দীদের মাধ্যমেই মৃত্যুর দৃশ্য রূপায়িত হতো।

 

৪. বিশ্ব নাট্যধারায় প্রভাব

মিশরীয় এই প্যাশান প্লে-এর প্রভাব পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের প্রাচীন নাট্যধারায় ছড়িয়ে পড়ে। পণ্ডিতদের মতে, মিশরীয় এই উর্বরতা ও পুনরুজ্জীবনের নাট্যধারাই সিরিয়ার ‘তাম্মুজ’, ব্যাবিলনিয়ার ‘ইশতার’, গ্রিসের ‘আদোনিস’ এবং পরবর্তীকালে প্রাচীন গ্রীক ট্র্যাজেডি ও ডায়োনিসাসের উৎসবের মূল ভিত্তি রচনা করেছিল।


মূল গ্রন্থ ও নোটসূত্র

বই: মিশর, বিশ্বরঙ্গালয় ও নাটক — গীতা সেনগুপ্ত।

নোট সংকলন: Concept of Theatre Note — এম এ ইমরান (M A Emran)


মুহাম্মদ আল ইমরান

নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।