ফরাসি থিয়েটারের ইতিহাস (French Theatre History)

 


ফরাসি থিয়েটারের ইতিহাস (French Theatre History)

১. পটভূমি ও প্রারম্ভিক বিকাশ

  • ধর্মীয় নাটক ও লোকনাট্য: মধ্যযুগের ঐতিহ্য বজায় রেখে ১৬ শতকের প্রথমার্ধে (১৫০০–১৫৫০) ফ্রান্সে আউটডোর ধর্মীয় নাটক, মিস্ট্রি (Mystery) ও মিরাকল (Miracle) নাটক এবং মেধাভিত্তিক হাস্যরসাত্মক ফার্স (Farce) ও 'সতীয়' (Sottie) অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
  • কনফ্রেতার্নিটি অফ দ্য প্যাশন (Confrérie de la Passion): ১৪০২ সালে গঠিত এই সংগঠনটি প্যারিসে ধর্মীয় নাটক পরিবেশনের রাজকীয় একচেটিয়া অধিকার (Monopoly) লাভ করে। ১৫৪৮ সালে তারা প্যারিসের প্রথম স্থায়ী পাবলিক প্রেক্ষাগৃহ ‘ওতেল দ্য বুরগোঁ’ (Hôtel de Bourgogne) নির্মাণ করে। পরবর্তীতে ধর্মীয় নাটক নিষিদ্ধ হলে তারা এটি অন্যান্য পেশাদার নাট্যদলকে ভাড়া দিত।
  • রেনেসাঁস ও ক্লাসিকাল আদর্শ: ১৬ শতকের মধ্যভাগে ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রভাবে গ্রীক ও রোমান নাটকের অনুকরণ শুরু হয়। ট্র্যাজেডিতে রোমান নাট্যকার সেনেকা (Seneca) এবং কমেডিতে প্লাউতুস (Plautus) ও ইতালীয় commedia erudita-র গভীর প্রভাব পড়ে।

    • এতিয়েন জোদে (Étienne Jodelle): ১৫৫৩ সালে ক্লাসিকাল ছাঁচে প্রথম ফরাসি ট্র্যাজেডি Cléopâtre Captive রচনা করেন।
    • পিয়ের দ্য লারিভে (Pierre de Larivey): ইতালীয় সৌখিন কমেডিকে ফরাসি সমাজ ও চরিত্রানুযায়ী রূপান্তর করে ফরাসি কমেডির ভিত্তি তৈরি করেন।
    • আলেক্সান্দ্রে হার্ডি (Alexandre Hardy): ফ্রান্সের প্রথম পেশাদার নাট্যকার, যিনি পাঁচ শতাধিক নাটক লিখে জনপ্রিয় ধারার ট্র্যাজিকমেডি ও ফার্সের প্রসার ঘটান।

 

২. নব্য-ক্লাসিকাল (Neoclassical) যুগ ও নাট্যনীতি

১৭ শতকে কার্ডিনাল রিশলিউ (Cardinal Richelieu) এবং চতুর্দশ লুই (Louis XIV)-এর রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ফরাসি নাটক ও শিল্পকলা রেনেসাঁসের শিখরে পৌঁছায়।

  • তিন ঐক্য (Three Unities): এরিস্টটলের ‘তিন ঐক্য’ (Three Unities) হলো নাটকের গঠনগত তিন অনুশাসন: কালের ঐক্য (কাহিনী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা), স্থানের ঐক্য (সমগ্র নাটক একটি নির্দিষ্ট স্থানে সংঘটিত হওয়া) এবং ক্রিয়ার ঐক্য (কোনো উপকাহিনীর ব্যত্যয় না ঘটিয়ে কেবল একটি মূল কাহিনী অনুসরণ করা)। ক্লাসিকাল আদর্শ অনুসরণে নাটক রচনার জন্য কঠোর তিনটি নিয়ম নির্ধারণ করা হয়:

1.   স্থানের ঐক্য (Unity of Place): সমস্ত ঘটনা একটিমাত্র স্থানে বা শহরে ঘটতে হবে।

2.   কালের ঐক্য (Unity of Time): নাটকের কাহিনী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হতে হবে।

3.   ঘটনার ঐক্য (Unity of Action): অপ্রাসঙ্গিক উপকাহিনী ছাড়া একটি মূল ঘটনার ওপর কেন্দ্র করে নাটক আবর্তিত হবে।

  • সম্ভাব্যতা ও মার্জিত আচরণ (Verisimilitude & Decorum): মঞ্চের ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে এবং চরিত্রের আচরণে নৈতিক মার্জিতবোধ বজায় রাখতে হবে।
  • ফরাসি আকাদেমি ও ল্য সিদ বিতর্ক (The Quarrel of Le Cid): ১৬৩৬–৩৭ সালে পিয়ের কর্ণেয়ের বিখ্যাত নাটক Le Cid বিপুল জনপ্রিয়তা পেলেও নীতিবাদীরা অভিযোগ তোলেন যে এতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অতিরিক্ত ঘটনা (যুদ্ধসহ) ঠাসা হয়েছে এবং পিতার হত্যাকারীকে নায়িকার বিয়ে মেনে নেওয়া মার্জিত আচরণের পরিপন্থী। কার্ডিনাল রিশলিউ নবগঠিত ফরাসি আকাদেমিকে (French Academy) এর বিচারের দায়িত্ব দেন। আকাদেমি ক্লাসিকাল নীতিমালার পক্ষে রায় দিয়ে ফরাসি থিয়েটারে নব্য-ক্লাসিকাল আদর্শ সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

 

৩. নাট্যকার

ক. পিয়ের কর্ণেয় (Pierre Corneille, 1606–1684)

  • তিনি 'পোলাইট ট্র্যাজেডি' (Polite Tragedy) বা নব্য-ক্লাসিকাল ট্র্যাজেডির প্রতিষ্ঠাতা।
  • নাট্যের থিম: তার নাটকের মূল বিষয় হলো 'সম্মান বনাম ভালোবাসা' (Love vs. Honor) এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির দ্বন্দ্বে রাষ্ট্র ও পরিবারের প্রতি কর্তব্যের জয়।
  • প্রধান রচনাবলী: Le Cid, Horace, Cinna, Polyeucte এবং সফল কমেডি The Liar (Le Menteur)।

খ. জাঁ রাসিন (Jean Racine, 1639–1699)

  • ফরাসি ক্লাসিকাল ট্র্যাজেডির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি।
  • নাট্যের কৌশল: গ্রীক নাট্যকার ইউরিপিদেসের অনুকরণে জটিল কাহিনীর পরিবর্তে সহজ গঠন এবং পাত্র-পাত্রীর অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক আবেগ ও কামনার দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলেন।
  • প্রধান রচনাবলী: Phèdre (তার শ্রেষ্ঠ রচনা), Andromaque, Britannicus, Bérénice।

গ. মলিয়ের (Molire / Jean-Baptiste Poquelin, 1622–1673)

  • বিশ্ব নাট্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কমেডি রচয়িতা ও অভিনেতা।
  • নাট্যের ধরন: ইতালীয় commedia dell'arte, ফরাসি ফার্স এবং সামাজিক ব্যঙ্গের সংমিশ্রণে চরিত্রকেন্দ্রিক হাই-কমেডি (Comedy of Manners & Character) সৃষ্টি করেন। তিনি মধ্যবিত্ত ও সমকালীন সমাজের ভন্ডামি ও অসঙ্গতিকে বিদ্রূপ করেন।
  • প্রধান রচনাবলী: Tartuffe (ধর্মীয় ভন্ডামির বিরুদ্ধে), The Misanthrope, The School for Wives, The Miser, The Imaginary Invalid, Les Prcieuses Ridicules।

 

৪. মঞ্চ স্থাপত্য, প্রযুক্তি ও নাট্য প্রতিষ্ঠান

  • টেনিস কোর্ট থিয়েটার (Jeu de Paume): ১৭ শতকে ফ্রান্সে আবৃত টেনিস কোর্টগুলোকে সাময়িকভাবে রূপান্তর করে প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করা হতো (যেমন: Theatre du Marais)।
  • সিনিক দৃশ্যপট ও ইতালীয় প্রযুক্তি:
    • ইতালীয় দৃষ্টিভ্রম (Perspective Scenery): কার্ডিনাল রিশলিউ ১৬৪১ সালে তার প্রাসাদে স্থায়ী প্রোসিনিয়াম আর্চযুক্ত Palais Cardinal (পরে Palais Royal) নির্মাণ করেন।
    • গিয়াকোমো তোরেল্লি (Giacomo Torelli): ইতালীয় প্রকৌশলী তোরেল্লি চ্যারিয়ট-অ্যান্ড-পোল (Chariot-and-pole) প্রযুক্তি এনে দ্রুত দৃশ্যপট পরিবর্তনের ব্যবস্থা করেন।
    • প্যালেস অফ উইংস (Palais of volonte): ট্র্যাজেডির জন্য একটি নিরপেক্ষ রাজপ্রাসাদের ব্যাকড্রপ ব্যবহার করা হতো যা যেকোনো স্থান নির্দেশ করতে পারতো।
  • কমেদি ফ্রঁসেজ (Comedie Francaise): ১৬৮০ সালে রাজা চতুর্দশ লুই-এর রাজকীয় আদেশে প্যারিসের প্রধান নাট্যদলগুলোকে একত্রিত করে বিশ্বের প্রথম জাতীয় থিয়েটার Comedie Francaise প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি স্পোকেন ফরাসি নাটকের একচেটিয়া অধিকার পায়।

 

৫. অভিনেতাদের সংগঠন ও সামাজিক অবস্থা

  • শেয়ারিং প্রথা (Sharing Plan): পেশাদার দলগুলো লভ্যাংশ ভাগের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কমেদি ফ্রঁসেজে ফুল-শেয়ারহোল্ডারদের Sociétaires(সোসিয়েতের্‌)/ অংশীদার বা শেয়ারহোল্ডার এবং চুক্তিবদ্ধ বেতনভুক অভিনেতাদের Pensionnaires বলা হতো।
  • সামাজিক মর্যাদা: রাজকীয় ভাতা ও সুরক্ষা থাকলেও ক্যাথলিক চার্চের নিয়মানুযায়ী অভিনেতাদের ব্যাপ্তিস্ম বা ধর্মীয় শেষকৃত্যের অধিকার দেওয়া হতো না।
  • মঞ্চে দর্শক বসবার কুপ্রথা: ১৬৩৬ সালে Le Cid থেকে শুরু করে দীর্ঘদিন অভিজাত দর্শকরা মঞ্চের দুপাশে বেঞ্চে বসে অভিনয় ব্যাহত করতো, যা পরে বন্ধ করা হয়। 

পরিশেষে বলা যায়, ফরাসি থিয়েটারের ইতিহাস কেবল বিনোদনের বিবর্তন নয়, বরং এটি ফরাসি সংস্কৃতি, সাহিত্য ও জাতীয় চেতনার এক সমৃদ্ধ প্রতিফলক। মধ্যযুগের ধর্মীয় ও লোকনাট্যের প্রারম্ভিক চর্চা থেকে শুরু করে ১৭ শতকের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নব্য-ক্লাসিকাল যুগে ফরাসি থিয়েটার তার স্বর্ণযুগ প্রত্যক্ষ করে। 'তিন ঐক্য' ও মার্জিত আচরণের কঠোর নাট্যনীতির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সাহিত্যের কাঠামোগত শৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, অন্যদিকে কর্ণেয়ের কর্তব্য-ভালোবাসার দ্বন্দ্ব, রাসিনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডি এবং মলিয়েরে-র তীক্ষ্ণ সামাজিক ব্যঙ্গনাট্য ফরাসি নাট্যসাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করে।

 

একদিকে টেনিস কোর্ট থিয়েটার থেকে বিশ্বের প্রথম জাতীয় থিয়েটার ‘কমেদি ফ্রঁসেজ’-এর যাত্রা এবং তোরেল্লির উদ্ভাবনী মঞ্চপ্রযুক্তি, অন্যদিকে চার্চের সামাজিক অবহেলা সত্ত্বেও অভিনেতাদের কাঠামোগত পেশাদারিত্ব—সব মিলিয়ে ফরাসি থিয়েটার এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ফরাসি রেনেসাঁস ও নব্য-ক্লাসিকাল যুগের এই ঐতিহ্য পরবর্তীতে সমগ্র ইউরোপীয় নাট্যচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং বিশ্ব নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে চিরন্তন এক মাইলফলক হিসেবে আজও ভাস্বর হয়ে রয়েছে।


মুহাম্মদ আল ইমরান

নাট্যকলা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।