ইতালীয় রেনেসাঁস এবং আধুনিক মঞ্চপ্রযুক্তির বিবর্তন


ইতালীয় রেনেসাঁসের সময় মঞ্চনকশা (stage design) এবং দৃশ্যপটের থিয়েটার প্রযুক্তিতে এক যুগান্তকারী বিবর্তন ঘটে, যা পরবর্তী প্রায় আড়াইশ বছরের ইউরোপীয় থিয়েটারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

 

১. ধ্রুপদী থিয়েটারের পুনর্জাগরণ ও 'টেরেন্স স্টেজ'

চতুর্দশ শতকে ধ্রুপদী নাটকের প্রতি আগ্রহ পুনরুজ্জীবিত হলেও, ১৪৮৬ সালের পূর্বে কোনো প্রাচীন গ্রিক বা রোমান নাটক মঞ্চস্থ হয়নি। ১৪৮৬ সালে রোমান একাডেমি পোম্পোনিয়াস লেটাসের নেতৃত্বে রোমান কমেডি পুনর্নির্মাণের প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে এবং এই বছরই ভিট্রুভিয়াসের বিখ্যাত স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ 'ডি আর্কিটেকচুরা' (De Architectura) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। এরপর ১৪৯৩ সালে ফ্রান্সে জোহানেস ট্রেশেল কর্তৃক প্রকাশিত টেরেন্সের নাটকের সংস্করণে প্রাচীন রোমান মঞ্চের একটি চিত্রায়িত পুনর্নির্মাণ দেখানো হয়, যা 'টেরেন্স স্টেজ' (Terence stage) নামে পরিচিতি পায়। এই নকশায় মঞ্চের পেছনের অংশে একটি টানা দেওয়াল বা ফাসাদ থাকত, যা বেশ কয়েকটি পর্দাযুক্ত দরজায় বিভক্ত ছিল এবং প্রতিটি দরজা একেকটি চরিত্রের বাড়িকে নির্দেশ করত।

 

২. পারসপেক্টিভ বা পরিপ্রেক্ষিতের সংযোজন

১৫শ শতকের প্রথমভাগে ফিলিপ্পো ব্রুনেলেস্কি এবং মাসাচ্চো রৈখিক পারসপেক্টিভ (linear perspective) বা দূরত্বের দৃষ্টিবিভ্রম ব্যবস্থার সুবিন্যস্ত রূপ দেন এবং আলবার্টির 'দেল্লা পিত্তুরা' (1435) গ্রন্থটি এই কৌশল ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। থিয়েটারে প্রথম নথিভুক্ত পারসপেক্টিভ দৃশ্যপটের ব্যবহার ঘটে ১৫০৮ সালে, যখন ফেরারাতে আরিওস্তোর 'দ্য কাস্কেট' নাটকের ব্যাকড্রপে পেলেগ্রিনো দা সান দানিয়েলে পারসপেক্টিভ চিত্র ব্যবহার করেন। ১৫১৩ সাল নাগাদ এর সাথে প্রথম এক জোড়া পার্শ্বীয় 'উইংস' (wings) যুক্ত করা হয় এবং ১৫৪০-এর দশকের মধ্যে ব্যাকড্রপ ও উইংসের সমন্বিত রূপটি স্থায়ী চেহারা নেয়।

শিল্পীগণ ভিট্রুভিয়াসের বর্ণিত ৩ ধরনের দৃশ্যপটকে পারসপেক্টিভের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন:

 

ট্র্যাজিক সিন (Tragic Scene): রাজকীয় প্রাসাদ, স্তম্ভ ও মূর্তি সংবলিত উচ্চাঙ্গের দৃশ্য।

কমিক সিন (Comic Scene): সাধারণ নাগরিকদের গৃহ, বারান্দা ও জানালার দৃশ্য।

স্যাটারিক বা পাস্টোরাল সিন (Satyric/Pastoral Scene): গাছপালা, পাহাড়, গুহা ও গ্রামীণ প্রকৃতি সংবলিত দৃশ্য।

 

৩. সেবাস্টিয়ানো সেরলিও এবং কৌণিক উইংস

১৫৪৫ সালে স্থপতি সেবাস্টিয়ানো সেরলিও তার 'আর্কিটেকচুরা' (Architettura) গ্রন্থে তৎকালীন ইতালীয় রেনেসাঁস মঞ্চশৈলীর বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেন। সেরলিও বিদ্যমান আয়তাকার প্রাসাদের কক্ষে থিয়েটার তৈরি করতেন, যেখানে দর্শকদের বসার স্থানটি ছিল অর্ধবৃত্তাকার এবং শাসকের জন্য সংরক্ষিত কেন্দ্রীয় আসনটির চোখের উচ্চতা অনুসারে দৃশ্যপটের উচ্চতা নির্ধারিত হতো। দূরত্বের বিভ্রম (illusion of distance) বৃদ্ধি করতে তার মঞ্চের পেছনের অংশটি ঢালু (raked stage) করা থাকত। সেরলিওর মঞ্চে প্রতি পাশে চার সেট কৌণিক উইংস (angled wings)—যার প্রথম তিনটি ছিল কোণাকুণি এবং চতুর্থটি চ্যাপ্টা—এবং একটি ব্যাকড্রপ ব্যবহৃত হতো। তবে সেরলিওর তৈরি এই দৃশ্যপটগুলো ছিল একদম স্থায়ী, যা নাটকের মাঝে পরিবর্তন করা কঠিন ছিল।

 

৪. দৃশ্যপট পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ও সাবাতিনির কৌশল

নাটকের ফাঁকে 'ইন্টারমেজ্জি' (intermezzi) নামক জমকালো মধ্যবর্তী পরিবেশনার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। ভিট্রুভিয়াসের বর্ণনা অনুসরণ করে রেনেসাঁস শিল্পীরা প্রিজম আকৃতির ঘূর্ণায়মান যন্ত্র 'পেরিয়াকতোই' (periaktoi) ব্যবহারের চেষ্টা করেন, যেমন ১৫৪৩ সালে কাস্ত্রোতে আরিস্তোতিলে দে সান গাল্লো এবং ১৫৮৩ সালে গিয়াকোমো বারোজ্জি দা ভিগনোলা এটি ব্যবহারের সুপারিশ করেন। পরবর্তীতে ১৬৩৮ সালে নিকোলা সাবাতিনি তার প্রকাশিত নির্দেশিকা গ্রন্থে দৃশ্যপট পরিবর্তনের নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেন, যার মধ্যে ছিল বিদ্যমান উইংসের ওপর দ্রুত নতুন আঁকা ক্যানভাস টেনে দেওয়া বা বইয়ের পাতার মতো উইংস ঘুরিয়ে দেওয়া।

 

৫. ফ্ল্যাট উইংস ও গাণিতিক পারসপেক্টিভ

কৌণিক উইংস সরিয়ে সম্পূর্ণ চ্যাপ্টা বা 'ফ্ল্যাট উইংস' (flat wings) ব্যবহারের জন্য পারসপেক্টিভের গাণিতিক হিসাবের প্রয়োজন ছিল, যা ১৬০০ সালে গুইডো ইউবাল্ডাসের গ্রন্থে সমাধানের মুখ দেখায়। ১৬০৬ সালে ফেরারাতে জিওভান বাত্তিস্তা আলেয়োত্তি প্রথম সফলভাবে ফ্ল্যাট উইংস ব্যবহার করেন এবং ১৬৫০ সালের মধ্যে পুরনো কৌণিক উইংস পুরোপুরি অপ্রচলিত হয়ে পড়ে। ফ্ল্যাট উইংসের প্রবর্তনের ফলে মঞ্চের মেঝে ও ছাদের খাঁজে (grooves) পরপর একাধিক উইংস সাজিয়ে রাখা সম্ভব হয় এবং সামনের উইংস সরিয়ে পেছনের নতুন দৃশ্যপট সহজে প্রকাশ করা যেত।

 

৬. জ্যাকোমো তোরেল্লি এবং 'রথ ও খুঁটি' প্রযুক্তি

দৃশ্যপট পরিবর্তনের সবচেয়ে সফল ও আধুনিক রূপটি নিয়ে আসেন জ্যাকোমো তোরেল্লি (Giacomo Torelli), যিনি ১৬৪১ থেকে ১৬৪৫ সালের মধ্যে ভেনিসের থিয়েত্রো নোভিসিমোতে 'চ্যারিয়ট-অ্যান্ড-পোল' (chariot-and-pole) বা 'রথ ও খুঁটি' পদ্ধতি উদ্ভাবন ও নিখুঁত করেন।

 

কার্যপদ্ধতি: মঞ্চের মেঝেতে লম্বা খাঁজ বা স্লট কাটা হতো এবং মেঝের নিচে ট্র্যাকে চলাচলকারী চাকাযুক্ত 'রথ' (chariots)-এর সাথে মেঝের ওপরের উইংসের কাঠামো যুক্ত থাকত।

যন্ত্রকৌশল: মেঝের নিচে জটিল রশি, পুলি ও কেন্দ্রীয় একটি উইঞ্চের (winch) সাহায্যে মাত্র একজন চালক পুরো মঞ্চের সমস্ত উইংস ও ব্যাকড্রপ একসাথে মুহূর্তের মধ্যে পরিবর্তন করতে পারতেন।

 

তোরেল্লির এই উদ্ভাবন ১৯শ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত সমগ্র ইউরোপজুড়ে থিয়েটার দৃশ্যপট পরিবর্তনের মানসম্মত প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 

৭. প্রোসেনিয়াম আর্চ, অলংকরণ ও ইউরোপব্যাপী বিস্তার

পারসপেক্টিভ দৃশ্যপট ও নেপথ্যের যন্ত্রকৌশলকে দর্শকদের চোখ থেকে আড়াল করতে এবং দৃষ্টিভ্রমকে একটি কাঠামোর মধ্যে ফ্রেমবন্দী করতে প্রোসেনিয়াম আর্চ (proscenium arch) উদ্ভাবিত হয়, যা ১৫৬০ সাল নাগাদ অস্থায়ী এবং ১৫৮৬ সালে স্থায়ী রূপ লাভ করে। দৃশ্যপটের ওপরের অংশ ঢাকতে আকাশ বা মেঘের ছবি আঁকা বর্ডার ঝুলানো হতো।

ফ্লোরেন্সে মেদিচি রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় বার্নার্দো বুওন্তালেন্তি ও তার ছাত্র জুলিও পারিজির নকশায় রাজকীয় উৎসব ও মঞ্চসজ্জা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। পরবর্তীতে জুলিও পারিজির মাধ্যমেই এই ইতালীয় নকশাশৈলী ইনিগো জোন্সের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে, কসমে লত্তির মাধ্যমে স্পেনে এবং জোসেফ ফুরটেনবাখের মাধ্যমে জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে ১৬৩৭ সালে ভেনিসে সাধারণ জনগণের জন্য প্রথম বাণিজ্যিক অপেরা হাউস চালু হলে রাজকীয় দরবারের এই চমকপ্রদ ইতালীয় দৃশ্যশৈলী সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছায় এবং সমগ্র ইউরোপের থিয়েটারে স্থায়ী রূপ লাভ করে

 

 

মুহাম্মদ আল ইমরান

নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।